ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তবে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিঘাত পড়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর। দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইসরায়েলের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরে রাজনীতি করা নেতানিয়াহু এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে তার বহু বছরের কৌশল ও রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বহু বছর ধরে নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সবসময় তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে ছিলেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু এখন যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোচ্ছে, তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এত বছরের রাজনৈতিক প্রচারণা ও সামরিক চাপের শেষ ফলাফল কী হলো?
নেতানিয়াহুর জন্য বিব্রতকর আরেকটি বিষয় হলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার সম্পর্কের বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যার মার্কিন প্রশাসনের ওপর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তিনি নিজের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার পুরো প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রভাব অনেকটাই সীমিত ছিল। এমনকি চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তেল আবিবের অবস্থান প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতি বিরোধীদের জন্য বড় রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। তারা বলছে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার দাবি সত্যিই কার্যকর হতো, তাহলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো আরও স্পষ্টভাবে চুক্তির অংশ হতো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে লেবানন ইস্যুকে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর অংশ হিসেবে লেবাননে সামরিক সংঘাতও কমিয়ে আনার বিষয়টি আলোচনার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে নেতানিয়াহুর জন্য নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান শত্রু হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
শুধু বিরোধী শিবির নয়, নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক জোটের ভেতরেও অসন্তোষ বাড়ছে। কট্টরপন্থী নেতারা মনে করছেন, এই চুক্তি ইরানের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মানতে ইসরায়েল বাধ্য নয় এবং দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যও নেতানিয়াহুর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈরুতকে ঘিরে সামরিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গে ট্রাম্প যে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন, তা ইতোমধ্যে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা এটিকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক আগের মতো দৃঢ় নেই।
নিরাপত্তা বরাবরই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি ছিল। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি কঠোর অবস্থান নিয়ে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান চালানো হলেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলে সমালোচকরা দাবি করছেন। এখন নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার ফলে ইরান পুরোপুরি দুর্বল হয়নি। বরং দেশটি আবারও আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে ফিরে এসেছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে। এই বাস্তবতায় ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কৌশল, যা মূলত ইরানকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
আগামী অক্টোবরের সম্ভাব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে কঠোর নিরাপত্তানীতির সমর্থকদেরও সন্তুষ্ট রাখতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মানচিত্রই বদলাচ্ছে না, বরং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আর সেই প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যার সামনে এখন রাজনৈতিক ও কৌশলগত—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।

