যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় চীনকে হারাতেই হবে। অন্যদিকে তাঁর প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এমন এক প্রশ্ন তুলেছে—ওয়াশিংটন কি চীনকে ঠেকাতে গিয়ে নিজ দেশের অন্যতম শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করে দিচ্ছে?
ট্রাম্প প্রশাসনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি কাগজে–কলমে একরকম হলেও বাস্তবে তা অনেক বেশি অস্থির, দ্বিধাগ্রস্ত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম পূর্ণ কর্মদিবসে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পকে দ্রুত এগিয়ে নিতে তিনি নিজের পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। তাঁর ভাষায়, এটি জরুরি অবস্থা; এই প্রযুক্তি দ্রুত তৈরি ও বিস্তার করতে হবে।
এই অবস্থানের পেছনে যুক্তি ছিল পরিষ্কার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি আগামী শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে যে দেশ সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে, সে দেশই অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ভূরাজনীতিতে বড় সুবিধা পাবে। তাই ধারণা ছিল, সরকার সিলিকন ভ্যালির পথ থেকে বাধা সরিয়ে দেবে এবং উদ্ভাবনের গতি বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু অ্যানথ্রপিককে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা দেখাচ্ছে, বাস্তব নীতি সেই ঘোষণার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
বিতর্কের কেন্দ্রে আছে অ্যানথ্রপিকের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ফেবল ৫। গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটি তাদের সবচেয়ে উন্নত ব্যবস্থা প্রকাশ করে। এটি ছিল ক্লদ মাইথস প্রিভিউয়ের হালনাগাদ ও জনসমক্ষে উন্মুক্ত সংস্করণ। মাইথস প্রিভিউ এপ্রিল মাসে ঘোষণার পর থেকেই আলোচনায় ছিল, কারণ অ্যানথ্রপিক জানিয়েছিল—ব্যবস্থাটি সাইবার নিরাপত্তা ও হ্যাকিং–সংক্রান্ত কাজে এতটাই শক্তিশালী যে প্রথমে শুধু অল্প কয়েকজন সাইবার নিরাপত্তা অংশীদারকে এটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।
এরপর কয়েক মাস ধরে অ্যানথ্রপিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করে। উদ্দেশ্য ছিল, কেউ যেন এই শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সাইবার হামলার জন্য ব্যবহার করতে না পারে, আবার সাইবার প্রতিরক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য বৈধ কাজে এর সক্ষমতা ব্যবহার করা যায়। তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষাও হয়, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে পরীক্ষাও ছিল। ফেবল প্রকাশের পর অনেক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ উল্টো অভিযোগ করেন, ব্যবস্থাটি হয়তো প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সীমাবদ্ধ।
কিন্তু শুক্রবার হোয়াইট হাউস হঠাৎ অবস্থান বদলায়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা ফেবল ৫–কে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিককে ফেবল ৫ এবং মাইথস ৫ নামের আরও নতুন সংস্করণ সরিয়ে নিতে ৯০ মিনিট সময় দেওয়া হয়। মাইথস ৫ তখন কেবল সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত ছিল। অ্যানথ্রপিক নির্দেশ মানেনি। এরপর সরকার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
এই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের অর্থ হলো, কোনো বিদেশি নাগরিক ফেবল ও মাইথস ব্যবহার করতে পারবে না—even যদি সে অ্যানথ্রপিকের যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কর্মরত কর্মীও হয়। দ্রুত নিয়ম মানতে গিয়ে অ্যানথ্রপিক সব গ্রাহকের জন্যই এই ব্যবস্থাগুলো বন্ধ করে দেয়। ফলে শুধু বিদেশি ব্যবহারকারী নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এবং নিজস্ব সরকারি সংস্থাগুলিও সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলোর একটি ব্যবহার করতে পারছে না।
সরকারের নিরাপত্তা উদ্বেগ পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। এমন কোনো প্রযুক্তি যদি সত্যিই ভয়াবহ সাইবার হামলার সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, তাহলে রাষ্ট্রের সতর্ক হওয়া স্বাভাবিক। জানা গেছে, অ্যামাজনের গবেষকেরা ট্রাম্প প্রশাসনকে ফেবল ৫–এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পাশ কাটানোর সম্ভাব্য একটি পথের কথা জানিয়েছিলেন। ওই পদ্ধতিতে ব্যবস্থা কিছু পরিচিত তথ্যপ্রযুক্তি দুর্বলতা শনাক্ত করতে পেরেছিল বলে বলা হয়েছে।
তবে সমস্যা হলো, প্রশাসন এই নিরাপত্তা উদ্বেগ সম্পর্কে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেছেন, নিরাপত্তা ভাঙার ঘটনাটি খুব গুরুতর, কিন্তু বিস্তারিত তথ্য শ্রেণিবদ্ধ। অন্যদিকে অ্যানথ্রপিক বলছে, যা দেখানো হয়েছে তা আসলেই গুরুতর নিরাপত্তা ভাঙা কি না, সেটি স্পষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুযায়ী, ফেবল থেকে যে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, তা হয় নিরীহ, নয়তো খুব সামান্য মাত্রার অনুসন্ধান।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কেটি মুসোরিসের মূল্যায়নও বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। তিনি জানিয়েছেন, অ্যানথ্রপিক তাঁকে হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি দেখিয়েছে। তাঁর মতে, ঘটনাটি মূলত সাইবার প্রতিরক্ষার স্বাভাবিক ব্যবহার হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ফেবলকে ত্রুটি খুঁজে বের করে ঠিক করতে বলেছিলেন। যখন তাকে নিরাপত্তা সমস্যা পর্যালোচনা করতে বলা হয়, সে অস্বীকার করে। কিন্তু কোড ঠিক করতে বলা হলে এবং আরও কিছু হাতে করা ধাপ যোগ করা হলে সে সাড়া দেয়। মুসোরিসের মতে, এটি সাইবার প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবস্থাটির প্রত্যাশিত আচরণ।
আরও বড় প্রশ্ন হলো, একই ধরনের সক্ষমতা থাকা অন্য ব্যবস্থাগুলোর ক্ষেত্রে কেন এমন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নেই। ওপেনএআইয়ের জিপিটি–৫.৫ একই ধরনের সাইবার সক্ষমতা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু সেটির ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা নেই। অ্যানথ্রপিকের কম উন্নত ওপাস ৪.৮ ব্যবস্থাও একই ধরনের অনেক কাজ করতে পারে, কিন্তু সেটিও একইভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়নি। সাইবার নিরাপত্তা কর্মকর্তা অ্যালেক্স স্ট্যামোসের মতে, যে কাজকে এত বড় ঝুঁকি বলা হচ্ছে, তা অন্য ব্যবস্থার সক্ষমতার মধ্যেও আগে থেকেই আছে।
এই জায়গাতেই সন্দেহ তৈরি হয়—এটি কি সত্যিই কেবল নিরাপত্তা নীতি, নাকি অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আদর্শিক চাপের অংশ? হোয়াইট হাউসের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের সম্পর্ক আগে থেকেই টানাপোড়েনপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত অন্য প্রযুক্তি কোম্পানির তুলনায় নিরাপত্তা নিয়ে বেশি সতর্ক অবস্থান নেয় এবং রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক উদারপন্থী বলে দেখা হয়। গত বছর হোয়াইট হাউসের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–বিষয়ক প্রধান ডেভিড স্যাকস অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির অভিযোগ তোলেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গোষ্ঠীর মতো বলে সমালোচনা করেন।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্রতিরক্ষা দপ্তর ও অ্যানথ্রপিকের একটি চুক্তি নিয়ে বড় বিরোধের পর পেন্টাগন প্রতিষ্ঠানটিকে সরবরাহ–শৃঙ্খল ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে। সেই সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন–বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলেছিলেন, সিদ্ধান্তটি আইনগত ভিত্তির চেয়ে বেশি আদর্শিকভাবে প্রভাবিত মনে হচ্ছে। অ্যানথ্রপিক আদালতে এই চিহ্নিতকরণকে চ্যালেঞ্জ করছে। শনিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, তিন মাস আগে পেন্টাগন অ্যানথ্রপিককে চিরতরে তাদের ভবন থেকে বের করে দিয়েছিল, আর প্রতিদিন প্রমাণ হচ্ছে সেটাই ঠিক ছিল।
অ্যানথ্রপিককে ঘিরে এই পুরো ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেতৃত্বের জন্য বিশৃঙ্খল সংকেত পাঠাচ্ছে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সাধারণত বড় ও কঠোর অস্ত্র। এটি সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করা কঠিন। একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা বিদেশি কর্মীর মধ্যে ব্যবহারিকভাবে দ্রুত পার্থক্য করা কঠিন। ফলে সরকার অ্যানথ্রপিককে কার্যত পুরো ব্যবস্থাই বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে।
এতে ক্ষতি শুধু অ্যানথ্রপিকের নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি, গবেষক এবং সরকারি সংস্থাগুলোও ফেবল ও মাইথসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাও মাইথসের উন্নত সাইবার সক্ষমতা ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এনভিডিয়া ও জুমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বহু সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি লিখে বলেছেন, এই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সাইবার প্রতিরক্ষাকারীদের কাছ থেকে সেরা ব্যবস্থা কেড়ে নিয়েছে, বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং প্রকৃত ঝুঁকি প্রমাণ না করেই যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেতৃত্বকে বিপদে ফেলেছে।
এখানে আরও বড় নীতিগত দ্বন্দ্ব আছে। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে বলছে, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হালকা নিয়ন্ত্রণ চায়। তারা এমন ধারণার বিরোধিতা করে এসেছে, যেখানে সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা বাজারে ছাড়া যাবে না। সাম্প্রতিক নির্বাহী আদেশ নিয়েও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব হয়েছিল, কারণ প্রযুক্তি খাতের ভেতরে অনেকে ভয় পাচ্ছিলেন, সরকার হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ওষুধ অনুমোদনের মতো পূর্বানুমোদন ব্যবস্থা তৈরি করবে। শেষ পর্যন্ত নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছিল, বাধ্যতামূলক সরকারি লাইসেন্স, পূর্বানুমোদন বা অনুমতির ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে না।
কিন্তু ফেবল ৫–এর ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যত সেটিই করে ফেলেছে। সরকার এখন নির্ধারণ করছে কোন উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা চলবে, কোনটি বন্ধ থাকবে। ফলে কথায় হালকা নিয়ন্ত্রণ, কাজে কঠোর নিয়ন্ত্রণ—এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডেভিড স্যাকস আবার এই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে দাঁড়িয়ে অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার চেয়ে ভোক্তামুখী ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
অ্যানথ্রপিকের গবেষকেরা ওয়াশিংটনে গেছেন এবং হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। হয়তো নির্দিষ্ট রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হতে পারে। কিন্তু মূল প্রশ্ন আর শুধু ফেবল ৫ চালু থাকবে কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি আদৌ স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও কৌশলগত কি না।
কারণ ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলছে না। ট্রাম্প প্রশাসন চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে এমন একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে চাপে ফেলছে, যার সত্যিই শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা আছে। তারা অ্যানথ্রপিককে একাধিকবার জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি বলছে, আবার একই সঙ্গে সরকারের কিছু কাজে ক্লদ মাইথস ব্যবহারের দৌড়ে আছে। তারা হালকা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে, আবার উন্নত ব্যবস্থার জন্য কার্যত লাইসেন্সধর্মী বাধা তৈরি করছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প উন্নত চিপ চীনে বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়েছেন।
নীতির ভেতরে এমন অসামঞ্জস্য প্রযুক্তি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি। একটি দ্রুত অগ্রসরমান শিল্পে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগ, গবেষণা, পণ্য উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির জন্য স্থিতিশীল নিয়ম দরকার। যদি সরকার হঠাৎ করে কোনো ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পারে, কোনো স্পষ্ট মানদণ্ড ছাড়া রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে এবং পরে কারণও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা না করে, তাহলে বিনিয়োগকারী, গবেষক ও ব্যবহারকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই বিপজ্জনক হতে পারে। তাই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দরকার—এ কথা অস্বীকার করা যায় না। উন্নত ব্যবস্থা সাইবার হামলা, ভুল তথ্য, জৈবঝুঁকি বা সামরিক ব্যবহারে বিপদ তৈরি করতে পারে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ যদি তাড়াহুড়ো, রাজনৈতিক পক্ষপাত, অস্পষ্ট তথ্য এবং অসম প্রয়োগের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে সেটি নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে উদ্ভাবন কমিয়ে দিতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞ অ্যালান রোজেনস্টাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এমন দ্রুত অগ্রসরমান ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নির্বাহী শাখাকে অনেক ক্ষমতা দেওয়ার যুক্তি আছে। কিন্তু একই সঙ্গে যদি সেই ক্ষমতা খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত, পক্ষপাত এবং হঠাৎ অবস্থান বদলের হাতে চলে যায়, তাহলে সেটিই বড় বিপদ হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো অনেক সুবিধা আছে। শক্তিশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্বমানের প্রযুক্তি কোম্পানি, বিপুল পুঁজি, প্রতিভাবান বিজ্ঞানী, উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামো—সব মিলিয়ে দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দৌড়ে এগিয়ে থাকার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু এই সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে নীতির স্থিরতা দরকার। শুধু দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার স্লোগান যথেষ্ট নয়; দরকার স্পষ্ট নিয়ম, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা পরীক্ষার গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি এবং সরকার–শিল্পখাতের মধ্যে আস্থা।
অ্যানথ্রপিক–ফেবল ৫ বিতর্ক তাই একটি কোম্পানির সমস্যা নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় সতর্কবার্তা। যদি সরকার নিরাপত্তার নামে শক্তিশালী প্রযুক্তিকে অকারণে আটকে দেয়, কিন্তু একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বিরুদ্ধে কৌশলগত অবস্থান দুর্বল রাখে, তাহলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি হতে পারে। চীনকে হারানোর লক্ষ্য যদি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে নিজ দেশের শীর্ষ উদ্ভাবকদের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং দায়িত্বশীল সহযোগিতা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সরল: যুক্তরাষ্ট্র কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্ব দেবে, নাকি নিজের ভেতরের নীতিগত বিশৃঙ্খলার কারণে সেই নেতৃত্ব ঝুঁকিতে ফেলবে? ফেবল ৫ নিষেধাজ্ঞা দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির দৌড়ে শুধু শক্তিশালী ব্যবস্থা বানানো যথেষ্ট নয়। যে দেশ নীতি, নিরাপত্তা ও উদ্ভাবনের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রাখতে পারবে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চীন নয়; কখনো কখনো তার নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অস্থিরতাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

