ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর যে সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে, তার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ইতোমধ্যেই ঘটেছে বলে দাবি করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার থেকেই কার্যত সংঘাতের সমাপ্তি হয়েছে, আর চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে আগামী শুক্রবার থেকে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দেওয়া এক বক্তব্যে আরাঘচি জানান, সাম্প্রতিক সমঝোতা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে লেবাননের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, লেবাননের ভূখণ্ডে যেকোনো ধরনের ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি বা হামলাকে তেহরান এই সমঝোতা স্মারকের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করবে।
আরাঘচির মতে, লেবাননের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হামলা বা দখলদারিত্বের ঘটনা ঘটলে তা কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনাই বাড়াবে না, বরং সদ্য সম্পাদিত সমঝোতার ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিতে পারে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে লেবাননের ওপর আক্রমণকে ইরান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামনে যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে, তা দুই ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে গুরুত্ব পাবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমের বিষয়গুলো।
এরপর দ্বিতীয় ধাপে আরও জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্ন।
চুক্তি ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জানিয়েছেন যে তিনি ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে আরোপিত নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালিতে ইতোমধ্যেই জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার করছে।
এদিকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সামরিক অভিযান বন্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা ধরে টানা আলোচনার পর দুই পক্ষ এই প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
ইরানের সরকারি ও ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো চুক্তিটিকে দেশটির কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটির সামরিক নেতৃত্বও দাবি করেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে স্পষ্ট বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে যে সংঘাতের পথ দীর্ঘস্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারে না।
তবে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হলেও ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের সন্দেহ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের গভীর অবিশ্বাস এখনো বহাল রয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান সমঝোতা চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং এটি উত্তেজনা কমিয়ে পরবর্তী আলোচনার পথ তৈরি করার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সংঘাত থামার ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য দূরত্ব রয়েছে। ফলে আগামী ৬০ দিনের আলোচনাই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতা স্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে কি না।

