মিডল ইস্ট আই-এর সংবাদদাতা মোহাম্মদ আমিনকে চলতি সপ্তাহে লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য একটি মর্যাদাপূর্ণ সাংবাদিকতা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ভিসা দেওয়া হয়নি।
আগামী বুধবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওয়ান ওয়ার্ল্ড মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে সুদান থেকে করা প্রতিবেদনের জন্য তিনি ‘বর্ষসেরা সাংবাদিক’ পুরস্কারের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিত থাকার কথা ছিল।
তবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর তাঁকে জানায়, তাঁর আট দিনের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়, তিনি প্রকৃত অর্থে স্বল্পমেয়াদি সফরের উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যেতে চাচ্ছেন কি না এবং সফর শেষে দেশ ত্যাগ করবেন কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট নয়।
সুদানের নাগরিক মোহাম্মদ আমিন এর আগে বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ সাংবাদিকতা পুরস্কার গ্রহণসহ একাধিকবার যুক্তরাজ্য সফর করেছেন। তিনি এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে একে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “ব্রিটিশ সাংবাদিকরা সুদানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং যুক্তরাজ্য সরকারও সুদান বিষয়ে সম্মেলনের আয়োজন করে। অথচ একই সময়ে সুদানি সাংবাদিকদের ভিসা দেওয়া হয় না। এটি এক ধরনের বৈপরীত্য।”
আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে এবং অন্যান্য সুদানিদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশে বাধা দেওয়া দেশটির সংকট সম্পর্কে ব্যাপক অজ্ঞতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, সুদানের মানুষ বর্তমানে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং বাস্তুচ্যুতির মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু ইউক্রেন, ইরানসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে সুদানের সংকট আড়ালে পড়ে গেছে।
ওয়ান ওয়ার্ল্ড মিডিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালক চিনওয়ে কালু-উমা বলেন, “এটি অত্যন্ত হতাশাজনক যে, আমাদের বর্ষসেরা সাংবাদিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত মোহাম্মদ, যিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুদানের ভেতর থেকে সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছেন, তিনি তাঁর এই স্বীকৃতি গ্রহণের জন্য লন্ডনে যেতে পারছেন না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের অনুষ্ঠানে তাঁর অনুপস্থিতি শুধু একটি ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; বরং এটি সুদানের জনগণের সেই সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি, যেখানে তারা নিজেদের কণ্ঠস্বর বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিতে নানামুখী বাধার সম্মুখীন হয়।”
মিডল ইস্ট আই-এর প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট বলেন, “যে যুদ্ধ সুদানকে ধ্বংস করে দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের মতো একটি দেশ একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত সুদানি সাংবাদিককে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানাবে—এটি অবিশ্বাস্য।”
তিনি বলেন, “সুদানে যা ঘটছে তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের একটি ঐতিহাসিক দায় রয়েছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেশটি ব্যর্থ হচ্ছে। মোহাম্মদের কাজকে উৎসাহিত ও সম্মান জানানো উচিত ছিল, তাঁকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তির মতো বিবেচনা করা নয়।”
ভিসা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর মোহাম্মদ আমিনকে জানায়, “আমরা সন্তুষ্ট নই যে আপনি ভিজিটর ভিসার আওতায় অনুমোদিত কোনো উদ্দেশ্যে প্রকৃত অর্থেই প্রবেশ করতে চাচ্ছেন অথবা সফর শেষে যুক্তরাজ্য ত্যাগ করবেন।”
যদিও এই সফরের পুরো ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নিয়েছিল মিডল ইস্ট আই এবং পুরস্কার আয়োজকদের পক্ষ থেকেও তাঁকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্র দপ্তর আরও জানায়, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আপিল বা প্রশাসনিক পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক সুদানি নাগরিকদের ভিসা প্রক্রিয়ায় কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাজ্য সরকার একটি নতুন ভিসা নীতি চালু করে, যার ফলে সুদান, আফগানিস্তান, ক্যামেরুন এবং মিয়ানমারের নাগরিকদের বিদেশ থেকে নতুন শিক্ষার্থী ভিসা আবেদন গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।
অছাত্র ভিসার ক্ষেত্রেও সুদানের নাগরিকদের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন মোহাম্মদ আমিন। তাঁর মতে, যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া সুদানিদের প্রতি এই ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক আচরণের শামিল।
খার্তুমে ব্রিটিশ দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় ভিসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাঁকে উগান্ডায় অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকমিশনে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিতে হয়।
এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে তিনি লন্ডন সফর করেছিলেন। সে সময় রোরি পেক অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সুদানে ওয়াগনার গোষ্ঠীর গণহত্যা এবং সামরিক অভ্যুত্থানসংক্রান্ত প্রতিবেদনের জন্য মার্টিন অ্যাডলার পুরস্কার লাভ করেন।
রোরি পেক অ্যাওয়ার্ডসের বিচারকরা সে সময় মন্তব্য করেছিলেন, “খার্তুমের বিক্ষোভ, দারফুরের ধ্বংসস্তূপ কিংবা সামরিক দমন-পীড়নের মধ্যেও মোহাম্মদ আমিনকে প্রায়ই ঘটনাস্থলে পৌঁছানো প্রথম সাংবাদিকদের একজন হিসেবে দেখা যায়।”
গত এক বছরে তিনি আল-ফাশির অঞ্চলের রক্তক্ষয়ী অবরোধ, মাদক চক্রের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়ার অভিযোগ এবং সংঘাতে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের হাতে কানাবি সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।
আল-তেকেইনা গ্রামের মানুষের প্রতিরোধ নিয়ে তাঁর একটি প্রতিবেদন সুদানের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিভিন্ন আরবি ভাষার সংবাদমাধ্যমও সেটি অনুবাদ করে প্রকাশ করে। পরদিন সুদানের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গ্রামটি পরিদর্শন করে এবং পুনর্গঠনে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। ছয় দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সেটিই ছিল গ্রামটিতে প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি সফর।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, “প্রতিটি আবেদন আমরা পৃথকভাবে এবং প্রকাশিত নীতিমালার আলোকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করি। ব্যক্তিগত ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে মন্তব্য না করা সরকারের দীর্ঘদিনের নীতি।”

