দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ভুগতে থাকা আর্জেন্টিনার জন্য বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দেশটির অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে ২০০ কোটি ডলারের একটি ঋণ প্যাকেজ অনুমোদন করা হয়েছে, যা আর্জেন্টিনার জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঋণ সহায়তার অনুমোদন দেয়। বিশেষ ধরনের একটি অর্থায়ন ব্যবস্থার আওতায় ঋণটি দেওয়া হচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমিয়ে আর্জেন্টিনাকে আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করা।
বিশ্বব্যাংকের এই অর্থায়ন সাধারণ ঋণের মতো নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থার অধীনে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে গ্যারান্টিদাতা প্রতিষ্ঠান ঋণের দায়ভার বহনে সহায়তা করবে। ফলে ঋণদাতাদের ঝুঁকি কমে এবং সংকটাপন্ন দেশগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহ তুলনামূলক সহজ হয়ে ওঠে।
এই ঋণের পেছনে দুটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দিচ্ছে। একটি হলো আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক, আর অন্যটি বহুপক্ষীয় বিনিয়োগ গ্যারান্টি সংস্থা। তাদের সমর্থনের কারণেই বিশ্বব্যাংক আর্জেন্টিনাকে এই অর্থায়ন সুবিধা দিতে সক্ষম হয়েছে।
ঋণটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় বছর। তবে এর সঙ্গে অতিরিক্ত তিন বছরের ছাড়কালও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ সম্ভব না হলে আর্জেন্টিনা আরও তিন বছর অতিরিক্ত সময় পাবে। এই নমনীয় ব্যবস্থাকে দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরে আর্জেন্টিনার অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। করোনা মহামারির পর দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে ডলারের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে অস্থিরতার কারণে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালে দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ১০০ শতাংশ অতিক্রম করে। এর ফলে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে শুরু করে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় আর্জেন্টিনার জনগণের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে।
অর্থনৈতিক এই সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় আসার পর একাধিক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেন। সরকারি ব্যয় কমানো, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাংকের এই নতুন ঋণ প্যাকেজ আর্জেন্টিনার অর্থনীতিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তি দিতে পারে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানো, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, শুধু ঋণ গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফিরিয়ে আনতে হলে উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে ২০০ কোটি ডলারের এই ঋণ আর্জেন্টিনার অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হলেও দেশটির প্রকৃত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা।

