হরমুজ প্রণালি শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্বাসনালি। এই পথ দিয়ে সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবাহিত হয়। তাই এই প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও তেলের বাজার, পণ্য পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সংকটে ঠিক সেটিই দেখা যাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গোপনে সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের একটি বড় কার্যক্রম তদারকি করছে। বিষয়টি শুধু সামরিক বা বাণিজ্যিক নয়; এর ভেতরে আছে জ্বালানি নিরাপত্তা, ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা, সমুদ্রপথের ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখার কঠিন হিসাব।
হরমুজ প্রণালির মুখে এমন এক পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ইরান বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহার করে এসেছে। এখন সেই একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে উপসাগরীয় তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। এটাই ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
অভিযানের বিষয়ে অবগত ১১ জন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তেল স্থানান্তরের দুটি বড় কেন্দ্র রয়েছে। একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলের কাছে, অন্যটি ওমানের সোহর বন্দরের অদূরে। এই দুটি এলাকা হরমুজ প্রণালির মুখের কাছাকাছি হওয়ায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে, বড় জাহাজ সরাসরি স্বাভাবিক রুটে চলাচল করতে পারে না। তখন ছোট বা মাঝারি তেলবাহী জাহাজের মাধ্যমে ধাপে ধাপে তেল সরিয়ে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজে স্থানান্তর করা হয়।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা জাহাজ চলাচলের তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, মে মাসের শুরু থেকে অন্তত ৯২টি জাহাজ এই কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। ১১ জুন পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ওই দুই স্থানে একসঙ্গে ১৭ জোড়া জাহাজ তেল স্থানান্তরের কাজে ব্যস্ত ছিল। এই সংখ্যা দেখায়, কার্যক্রমটি বিচ্ছিন্ন বা ছোট পরিসরের নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত সামুদ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তদারকি। সূত্রগুলো বলছে, আকাশ ও জলপথে ড্রোন, পাশাপাশি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে জাহাজগুলোর চলাচল পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, সেন্ট্রাল কমান্ডের কোনো বাহিনী সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কাজে সরাসরি অংশ নেয়নি। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তেল ওঠানো বা নামানোর কাজ করছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি; তবে নজরদারি, পথনির্দেশ ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
৯ জুন ইরানের গুলিতে একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বলে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। অভিযান সম্পর্কে অবগত সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তাসহ চারটি সূত্রের দাবি, ওই হেলিকপ্টারটি এই মিশনের অংশ ছিল। সেদিন সোহর বন্দরের অদূরে একটি ছোট এলাকায় ১২টি তেলবাহী জাহাজ অবস্থান করছিল বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়। তবে ওই হেলিকপ্টারের নির্দিষ্ট দায়িত্ব কী ছিল, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হেলিকপ্টারের দুই আরোহীকে একটি ড্রোন নৌযানের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনাটি দেখায়, কার্যক্রমটি শুধু বাণিজ্যিক ঝুঁকির নয়; এর সঙ্গে সরাসরি সামরিক উত্তেজনার সম্পর্ক আছে। হরমুজ প্রণালির মুখে যে দুটি তেল স্থানান্তর কেন্দ্র ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো ইরানের নবগঠিত পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটির ঘোষিত সীমানার খুব কাছে। এই সংস্থা হরমুজ প্রণালি তদারকির জন্য গঠিত। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তাদের নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন এই কার্যক্রম চলাকালে ফুজাইরাহ বন্দর বারবার ইরানের হামলার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড জানিয়েছে, গত সপ্তাহান্তে ওমান উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত উৎসের একটি নিক্ষিপ্ত বস্তু আঘাত করে। ক্রুরা নিরাপদ ছিলেন। কিছু তেল বা পণ্য লিক হলেও পরিবেশগত ক্ষতি হয়নি বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। তবে ওই জাহাজটি জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর কার্যক্রমে যুক্ত ছিল কি না, তা তারা বলেনি।
এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হয় এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বিকল্প পথ তৈরি করা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সদ্য ঘোষিত একটি কাঠামোগত শান্তি চুক্তির আওতায় শুক্রবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। তবে সেই চুক্তির বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়। চুক্তির ফলে সমুদ্রে তেল স্থানান্তর কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।
এই জটিলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরানও একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে। ২০ মে প্রকাশিত রয়টার্সের আরেক অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রণালির বিপরীত পাশে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সেখানে দ্বীপভিত্তিক চেকপয়েন্ট, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং কিছু ক্ষেত্রে ফি আদায়ের ব্যবস্থাও আছে। অর্থাৎ, হরমুজে এখন এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ছায়া-ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামুদ্রিক নজরদারি এবং জ্বালানি বাণিজ্য একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে।
জাহাজ চলাচলের এই নতুন ব্যবস্থায় ধাপে ধাপে যাত্রা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তেল স্থানান্তর কার্যক্রমে জড়িত একটি বেসরকারি নিরাপত্তা ঠিকাদারসহ আটটি সূত্র জানিয়েছে, পুরো অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। একটি সূত্র ও স্যাটেলাইট চিত্রের তথ্য অনুযায়ী, তেলবাহী জাহাজগুলোকে প্রণালিতে ঢোকার আগে নির্দিষ্ট মিলনস্থলে যেতে হয়। এরপর তারা ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়, যাতে প্রতিটি জাহাজের মধ্যে প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরত্ব থাকে।
চারটি সূত্র জানিয়েছে, এসব জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রাখা হয় এবং রাতের বেলায় আলো ম্লান করে দেওয়া হয়। এর ফলে তারা ইরানের নজরদারি এড়াতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। রাতের অন্ধকারে কম আলোয়, সীমিত তথ্য নিয়ে, নির্দিষ্ট গতিতে বহু জাহাজ চলাচল করলে সংঘর্ষের আশঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়।
নির্ধারিত কয়েকটি পথচিহ্ন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জাহাজগুলোর গতিবিধি নজরে রাখে। প্রণালি পার হওয়ার পর, ইরান যে অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করে তার ঠিক বাইরে গিয়ে ছোট বা মাঝারি তেলবাহী জাহাজগুলো বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের পাশে ভেড়ে। তারপর শুরু হয় তেল স্থানান্তর। এই কাজ শেষ হতে সাধারণত ২৪ থেকে ৪০ ঘণ্টা সময় লাগে। এরপর খালি জাহাজ আবার প্রণালি পেরিয়ে ফিরে যায়, আর তেলবোঝাই বড় জাহাজ গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়।
এই পদ্ধতি কার্যকর হলেও অদক্ষ। কারণ এতে সময় বেশি লাগে, ঝুঁকি বেশি থাকে এবং প্রতিটি ধাপে সামরিক নজরদারি দরকার হয়। তবু কিছু শিপিং কোম্পানি ইরানের অবরোধ সত্ত্বেও তেল বহনে রাজি হওয়ায় ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। সামুদ্রিক ঝুঁকি বিশ্লেষক নোয়াম রেইদান সতর্ক করেছেন, ইরান কখন ড্রোন বা সশস্ত্র নৌযান ব্যবহার করে এসব জাহাজের চলাচল থামানোর সিদ্ধান্ত নেবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
ইরান বহু বছর ধরে তেলের উৎস গোপন রাখতে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর ব্যবহার করে এসেছে। যুদ্ধের আগে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর প্রয়োজনে তারা সাধারণত একবারে মাত্র ২টি জাহাজ ব্যবহার করত। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা অনেক বড়। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় উৎপাদকরা ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে কিছুটা দূরে থেকে অপরিশোধিত তেল, ঘনীভূত তরল জ্বালানি এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পাঠাতে পারছে।
রয়টার্স ২ মে থেকে ১১ জুনের মধ্যে তোলা এক ডজনের বেশি স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করেছে। এসব চিত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উপসাগরীয় তেলবাহী বহর এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত জাহাজগুলোর মধ্যে সমুদ্রে তেল স্থানান্তরের দৃশ্য পাওয়া গেছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করেও একই সময়ে ওই এলাকায় একাধিক নির্ধারিত মিলনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্সের হিসাব, মে মাসের শুরু থেকে এই সমুদ্রভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ৯ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবাহিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এই সংখ্যা বড় মনে হলেও যুদ্ধের আগে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের গড় প্রবাহের তুলনায় তা অনেক কম। অর্থাৎ, বিকল্প ব্যবস্থা চালু থাকলেও তা স্বাভাবিক সরবরাহ পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক বিদ্রূপও কম নয়। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে যে গোপন বহর ও অদৃশ্য চলাচলের পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে ইরান, রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখন সেই ধরনের কৌশলই যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে বলে কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন। এর অর্থ হলো, পুরোনো নিয়মভিত্তিক সামুদ্রিক বাণিজ্য দুর্বল হলে শক্তিধর রাষ্ট্রও বাস্তবতার চাপে অপ্রচলিত পথে হাঁটতে বাধ্য হতে পারে।
অভিযানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছয়টি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনী সরাসরি নিরাপত্তা বহর মোতায়েন না করে আকাশপথে নজরদারি, নিয়ম মানা হচ্ছে কি না তা যাচাই এবং চলাচল পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ের মাধ্যমে জাহাজগুলোকে সহায়তা করছে। অংশ নিতে আগ্রহী জাহাজ পরিচালনাকারীদের আগে একটি যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে হয়।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা দুটি প্রাথমিক নথি অনুযায়ী, অপারেটরদের পূর্ণাঙ্গ ভৌগোলিক চলাচলের ইতিহাস, প্রকৃত মালিকানার তথ্য, পণ্যসংক্রান্ত নথিপত্র এবং পণ্য পরীক্ষার অনুমতি দিতে হয়। অনুমোদনের পর জাহাজগুলো নির্দিষ্ট সময়সূচি পায় এবং যাত্রাপথে বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে।
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি এই কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বলে শিপিং নথিতে দেখা গেছে। ছয়টি সূত্র বলেছে, আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। কুয়েতের রাষ্ট্রীয় তেলবাহী জাহাজ কোম্পানিও কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ৬ জুন—যা এই কার্যক্রমের সবচেয়ে ব্যস্ত দিনগুলোর একটি—সোহর উপকূলের কাছে কুয়েতের একটি জাহাজ থেকে প্রায় ২৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। তেল গ্রহণকারী জাহাজটি পাঁচ দিন পর ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কাছে দেখা যায় এবং সেটি চীনের উদ্দেশে যাচ্ছিল।
তবে এই ব্যবস্থা নিয়ে সামুদ্রিক খাতের উদ্বেগও বাড়ছে। একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। জাহাজগুলোর অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রাখা হচ্ছে, আবার কোম্পানিগুলো প্রচলিত রিপোর্টিং কেন্দ্রের মাধ্যমেও যথেষ্ট তথ্য দিচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনা, ভুল বোঝাবুঝি এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। রাতের অন্ধকারে আলো কমিয়ে চলাচল করা জাহাজ জরুরি মুহূর্তে দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে না পারলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।
এই পুরো ঘটনা একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে। জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু উৎপাদন বা মূল্য নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি সামরিক নজরদারি, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত গোপনতা, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে শুধু উপসাগরীয় দেশ নয়, এশিয়া, ইউরোপ এবং বৈশ্বিক বাজারও চাপের মুখে পড়ে। তেলের সরবরাহ কমলে পরিবহন খরচ বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, আর তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই ব্যবস্থা হয়তো স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। নোয়াম রেইদানও বলেছেন, এই পদ্ধতির মধ্যে তিনি কোনো স্থায়ী সমাধান দেখেন না; বরং এটি এক অসাধারণ সংকটময় পরিস্থিতিতে নেওয়া অস্থায়ী ব্যবস্থা। বাস্তবতাও তাই বলছে। প্রণালি স্বাভাবিকভাবে না খুললে, জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর দিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ দীর্ঘদিন নিরাপদ রাখা কঠিন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, হরমুজ সংকট কি ভবিষ্যতের জ্বালানি রাজনীতির নতুন রূপ দেখিয়ে দিচ্ছে? যদি সমুদ্রপথ অরক্ষিত হয়ে পড়ে, যদি রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ঘোষিত সীমানা ও সামরিক ক্ষমতা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তবে তেলের বাজার আরও অনিশ্চিত হবে। আর যদি বড় শক্তিগুলোও গোপন বা আধা-গোপন নৌকৌশলের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
হরমুজের মুখে এই তেল স্থানান্তর কার্যক্রম তাই কেবল একটি সাময়িক জ্বালানি ব্যবস্থা নয়। এটি দেখাচ্ছে, আধুনিক ভূরাজনীতিতে পুরোনো নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশলও কখনো কখনো বৈশ্বিক সরবরাহ বাঁচানোর অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই অস্ত্র ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত। তেল চলাচল হয়তো আপাতত থামেনি, কিন্তু হরমুজের পানিতে এখন যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ বৈশ্বিক অর্থনীতি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

