ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধ এখন এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন মাসের সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটছে। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইলেক্ট্রনিকভাবে একটি চুক্তিতে সই করেছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার কথা।
প্রথম দেখায় এটি একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য মনে হতে পারে। যুদ্ধ থামছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলোচনা হচ্ছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে কথা বলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধ শুরু করার সময় ট্রাম্প যে লক্ষ্যগুলো সামনে রেখেছিলেন, সেগুলোর কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর একযোগে বিমান হামলা শুরু করে, তখন ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষা ছিল অত্যন্ত কঠোর। তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, প্রতিরক্ষা শিল্প ভেঙে দেওয়া, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ করা এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের শাসনতন্ত্র বদলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করা। অর্থাৎ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল শুধু সামরিক চাপ সৃষ্টি নয়; বরং ইরানের ক্ষমতার কাঠামোকে ভেঙে দেওয়ার মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা।
কিন্তু আজ যখন যুদ্ধবিরতির কথা উঠছে, তখন সেই লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সামরিক সক্ষমতা: আঘাত বড়, কিন্তু শেষ নয়
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা কাঠামো দুর্বল করে দেওয়া। যুদ্ধের আগে ইরানের হাতে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ছিল বলে রয়টার্সের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই হাজার থেকে ৬ হাজার। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম ছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের ১৬১টি নৌযান ধ্বংস করেছে এবং দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৮২ শতাংশ অকেজো করে দিয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে ১ হাজার ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬ হাজার ড্রোন আটকানোর কথাও জানানো হয়। আরও দাবি করা হয়, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের তিন ভাগের এক ভাগ ধ্বংস করা হয়েছে।
এই হিসাবগুলো সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো ইরানের সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমন প্রমাণ দেয় না। বরং বাস্তবতা হলো, বড় ক্ষতির পরও ইরান আঞ্চলিক হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা ধরে রেখেছে। অ্যাডমিরাল কুপার নিজেও স্বীকার করেছেন, এই অঞ্চলে মাঝারি ও ক্ষুদ্র মাত্রার হামলা চালানোর সামর্থ্য এখনো ইরানের রয়েছে।
এর প্রমাণও পাওয়া গেছে জুনের শুরুতে। তখন ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ কুয়েত ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং ইসরায়েলের দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ইরানের বিমানবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়লেও ছোট নৌযান, মেশিনগান ও ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রে চাপ তৈরি করার ক্ষমতা তাদের রয়ে গেছে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আঘাত করেছে, কিন্তু ইরানকে অচল করতে পারেনি। এই পার্থক্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের মিত্র গোষ্ঠী: চাপ আছে, বিচ্ছেদ নেই
ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি লক্ষ্য ছিল ইরান যেন লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোকে আর সহায়তা করতে না পারে। কারণ এই গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়।
যুদ্ধের আগে ইসরায়েলি হামলায় হামাস ও হিজবুল্লাহর কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হলেও ইরান তাদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেনি। বরং হিজবুল্লাহ ২ মার্চ যুদ্ধে যুক্ত হয়ে ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়। এর পর ইসরায়েল লেবাননে বিমান ও স্থল হামলা শুরু করে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এতে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ জন নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল হলেও তা ভেঙে পড়েনি। ট্রাম্প এখন হিজবুল্লাহকে বড় হুমকি হিসেবে না দেখিয়ে ছোট উপদ্রবের মতো করে তুলে ধরছেন। এমনকি তিনি ইসরায়েলের বদলে সিরিয়ার নতুন নেতা আহমেদ আল-শারার হাতে হিজবুল্লাহ দমনের দায়িত্ব দেখতে চান বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এখানেও ট্রাম্পের ভাষা বদলের বিষয়টি স্পষ্ট। যুদ্ধের শুরুতে যে বিষয়কে বড় নিরাপত্তা হুমকি বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির সময় সেটিকে ছোট করে দেখানো হচ্ছে। এর অর্থ হতে পারে, লক্ষ্য অর্জন না হলে রাজনৈতিক ভাষা বদলে দিয়ে বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি: সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ও সংবেদনশীল বিষয় ছিল পারমাণবিক কর্মসূচি। ট্রাম্পের মূল দাবি ছিল, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের পথে এগোতে না পারে। তাই ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর তিনি দাবি করেছিলেন, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে। তাদের মতে, যুদ্ধের পরও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসেনি। ইরান চাইলে এখনো এক বছরেরও কম সময়ে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে যেতে পারে। এপি জানিয়েছে, ইরানের কাছে এখনো প্রায় ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
এই তথ্য ট্রাম্পের জয়ের দাবিকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে। কারণ যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যই যদি পারমাণবিক সক্ষমতা বন্ধ করা হয়, আর সেই সক্ষমতা যদি বড় অংশে থেকে যায়, তাহলে বিজয়ের দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন সমঝোতা স্মারকে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেই। আপাতত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। অর্থাৎ যুদ্ধের পরিণতি আবার আলোচনার টেবিলেই ফিরে এসেছে।
যে সমস্যার সমাধানের জন্য সামরিক পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই সমস্যার সমাধানও কূটনৈতিক আলোচনার ওপর নির্ভর করছে।
শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের স্বপ্ন: সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা?
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া যুদ্ধ থামবে না। মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প এটিকে শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে গেছে। খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ক্ষমতায় আসেন। স্টিমসন সেন্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের ফলে ইরানের কট্টরপন্থী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
এতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা করেছিল, তা ঘটেনি। বরং পুরোনো কাঠামোর জায়গায় আরও কট্টর অবস্থান তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প এখন দাবি করছেন, তিনি কখনো শাসনতন্ত্র পরিবর্তন চাননি। তিনি ইরানের নতুন নেতৃত্বকে যুক্তিবাদী, ভালো এবং অউগ্র বলে তুলে ধরছেন।
কিন্তু এই অবস্থান তার আগের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। মোজতবা খামেনি আবার সম্প্রতি বলেছেন, ২০৪০ সালের মধ্যে ইসরায়েলের অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে তাকে খুব সহজে যুক্তিবাদী বা নরম অবস্থানের নেতা হিসেবে দেখানো বাস্তবসম্মত নয়।
এখানে ট্রাম্পের কৌশল পরিষ্কার। যখন শক্ত অবস্থান থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, তখন প্রতিপক্ষকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরে চুক্তিকে সফল দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
হরমুজ প্রণালি: বিজয়, নাকি নিজের তৈরি সংকটের অবসান?
চুক্তির বড় অংশজুড়ে আছে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রশ্ন। ট্রাম্প এটিকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু এখানেও বাস্তবতা জটিল।
যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, সারের সংকট দেখা দেয় এবং বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে।
ওমানের মুসানদাম থেকে ৩০ মে ২০২৬ ধারণ করা চিত্রে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের অবস্থান দেখা যায়। এই প্রণালি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি স্টিমসন সেন্টারকে বলেন, এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন পরিবারগুলোর অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। অর্থাৎ যে প্রণালি যুদ্ধের আগে খোলা ছিল, যুদ্ধের ফলে সেটি বন্ধ হলো; এখন সেটি আবার খুলে দেওয়াকে বিজয় বলা হচ্ছে।
এই জায়গায় ইরান কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পেরেছে। সেই চাপই আলোচনা টেবিলে ইরানের অবস্থান শক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের চোখে চুক্তির অর্থ
ট্রাম্প এই সমঝোতাকে বড় বিজয় হিসেবে দেখালেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বড় অংশ তা মানতে নারাজ। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবার্ট কাগান এই সমাপ্তিকে ট্রাম্পের পিছু হটা হিসেবে দেখছেন। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনা তুসির মতে, যুদ্ধের শুরুতে লক্ষ্য ছিল বিশাল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে বাধ্য হয়েছে।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির রবার্ট লিটওয়াকও মনে করেন, শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের মতো লক্ষ্য অর্জন না হওয়ায় ট্রাম্প এখন লেনদেনমূলক এক চুক্তির দিকে এগোচ্ছেন। তার মতে, এটি ওবামা আমলের জেসিপিওএ চুক্তির ভিন্ন রূপ হয়ে উঠতে পারে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল বি শাপিরো আরও কঠোর মূল্যায়ন করেছেন। তার আশঙ্কা, এই চুক্তি ওবামা আমলের চুক্তির চেয়েও দুর্বল হতে পারে। কারণ ইরান আলোচনা দীর্ঘায়িত করে সুবিধা নেওয়ার কৌশল ভালো জানে।
অন্যদিকে ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের মার্ক দুবোভিৎস মনে করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সমাধান সম্ভব নয়; বরং ইরানের জনগণকে সমর্থন দিয়ে শাসনতন্ত্র পরিবর্তনই একমাত্র পথ। তবে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওয়ালি নাসর ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, ইরানের প্রধান লক্ষ্য এখন শাসনতন্ত্র টিকিয়ে রাখা। ইরান ট্রাম্পকে বিশ্বাস করে না; তারা ধীরে ধীরে অবরোধ প্রত্যাহার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করে তারপর পারমাণবিক আলোচনায় এগোবে।
ইসরায়েলের অস্বস্তি
এই চুক্তিতে সবচেয়ে অখুশি পক্ষগুলোর একটি হলো ইসরায়েল। যুদ্ধের অংশীদার হলেও শান্তি প্রক্রিয়ার মূল আলোচনায় ইসরায়েলকে রাখা হয়নি বলে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট ইন্টারন্যাশনালের এইচ এ হেলিয়ার মনে করেন, ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহল এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে অসন্তুষ্ট। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে উত্তেজনা বাড়তে পারে।
দক্ষিণ লেবাননের মারজায়ুন থেকে ২২ মার্চ ২০২৫ দেখা ইসরায়েলি হামলার ধোঁয়া এই আঞ্চলিক সংকটের গভীরতা বুঝিয়ে দেয়। ইরান, ইসরায়েল, লেবানন, গাজা, ইয়েমেন—সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ শুধু দুই দেশের সংঘাত ছিল না; এটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের পর আবার কূটনীতিতেই ফেরা
এই যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো, ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য এবং হাজারো ইরানি নাগরিকের প্রাণহানির পরও যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত বড় লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি। পারমাণবিক কর্মসূচি আঘাত পেয়েছে, কিন্তু বন্ধ হয়নি। ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো চাপে পড়েছে, কিন্তু ইরানের প্রভাব ভেঙে যায়নি। শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের আশা বাস্তব হয়নি। হরমুজ প্রণালি আবার খুলতে পারে, কিন্তু সেটি যুদ্ধের আগেই খোলা ছিল।
তাই ট্রাম্পের বিজয়ের দাবি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হলেও কৌশলগতভাবে দুর্বল। তিনি হয়তো মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধবিরতি দেখিয়ে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে চাইছেন। কিন্তু স্থায়ী শান্তি, ইরানের পারমাণবিক ঝুঁকির অবসান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্থিতি—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
আগামী ৬০ দিনের আলোচনা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়েই বোঝা যাবে, যুদ্ধবিরতি সত্যিই স্থায়ী সমাধানের পথ খুলবে, নাকি এটি শুধু একটি সাময়িক বিরতি।
সবশেষে বলা যায়, সামরিক শক্তি দিয়ে যে সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব হয়নি, যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত সেই কূটনীতির পথেই ফিরতে হচ্ছে। আর এই বাস্তবতাই ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শিক্ষা।

