মাসের পর মাস ধরে চলা তীব্র উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পর অবশেষে কূটনীতির পথে এক বড় অগ্রগতি দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে এবং দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লমেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইলেকট্রনিকভাবে এই চুক্তিতে সই করেন। জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে নৈশভোজের সময় ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই এবং আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিশ্চিত করেছেন যে, এই ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি’ অবিলম্বে কার্যকর হবে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রথম দেখায় এটি একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য এবং যুদ্ধ থামানোর রূপরেখা মনে হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে বড় প্রশ্ন—গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে ট্রাম্প যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার কতটা পূরণ হলো?
যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলোর বিপরীতে বাস্তব ফলাফলের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
সামরিক সক্ষমতা: আঘাত বড়, কিন্তু শেষ নয়
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের আড়াই থেকে ছয় হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভান্ডার এবং প্রতিরক্ষা শিল্প ভেঙে দেওয়া। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, মিত্রবাহিনী ইরানের ১৬১টি নৌযান ধ্বংস করেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৮২ শতাংশ অকেজো করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের তিন ভাগের এক ভাগ ধ্বংস করেছে।
তবে এই বড় ক্ষতির পরও ইরানকে পুরোপুরি অচল করা যায়নি। জুনের শুরুতে কুয়েত, বাহরাইন ও ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রমাণ করে যে, তারা এখনো আঞ্চলিক হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। ছোট নৌযান ও ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রে চাপ তৈরি করার ক্ষমতাও ইরানের রয়ে গেছে।
ইরানের মিত্র গোষ্ঠী: চাপ থাকলেও বিচ্ছেদ ঘটেনি
লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাসের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইরানের প্রভাব গুঁড়িয়ে দেওয়া ছিল ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য। যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হলেও ইরান প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেনি। অথচ যুদ্ধের শুরুতে যে হিজবুল্লাহকে আমেরিকার জন্য বিশাল নিরাপত্তা হুমকি বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির সময়ে ট্রাম্প তাদের ‘ছোট উপদ্রব’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সিরিয়ার নতুন নেতা আহমেদ আল-শারার হাতে তাদের দমনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে রাজনৈতিক ভাষা বদলের শামিল।
পারমাণবিক কর্মসূচি: সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা
পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পর ট্রাম্প ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত সম্পূর্ণ ধ্বংসের দাবি করলেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও এপির মূল্যায়ন ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। ইরানের কাছে এখনো প্রায় ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব। নতুন সমঝোতায় ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমাতে রাজি হলেও তা স্থানান্তরের কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। আপাত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনার কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ সামরিক শক্তি দিয়ে যে সমস্যার সমাধান চাওয়া হয়েছিল, তা আবার আলোচনার টেবিলেই ফিরে এসেছে।
শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের স্বপ্ন: সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা
আমেরিকান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প এটিকে শাসনতন্ত্র পরিবর্তনের বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন এবং ইরানি জনগণকে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে খামেনির ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ক্ষমতায় আসেন এবং কট্টরপন্থী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মোজতবা খামেনির সাম্প্রতিক ‘২০৪০ সালের মধ্যে ইসরায়েলের অস্তিত্ব থাকবে না’ ঘোষণার পরও ট্রাম্প এখন ইরানের নতুন নেতৃত্বকে ‘যুক্তিবাদী ও অউগ্র’ বলে তুলে ধরছেন, যা মূলত কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে চুক্তিকে সফল দেখানোর একটি কৌশল মাত্র।
হরমুজ প্রণালি: নিজের তৈরি সংকটের অবসান?
চুক্তির অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টিকে দেখছেন ট্রাম্প। তবে বাস্তবতায়, এই প্রণালিটি যুদ্ধের আগে স্বাভাবিকই ছিল। যুদ্ধের কারণে এটি বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ায় এবং মার্কিন পরিবারগুলোর অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়। ফলে, নিজের তৈরি করা অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচতে যুদ্ধবিরতি করে প্রণালিটি খুলে দেওয়াকে ট্রাম্পের একক ‘বিজয়’ বলা চলে না; বরং ইরান এখানে ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের চোখে এই চুক্তি ও ইসরায়েলের অস্বস্তি
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বড় অংশ এই সমাপ্তিকে ট্রাম্পের পিছু হটা এবং একটি ‘লেনদেনমূলক চুক্তি’ হিসেবে দেখছেন, যা ওবামা আমলের জেসিপিওএ (JCPOA) চুক্তির চেয়েও দুর্বল হতে পারে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবার্ট কাগান এবং সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনা তুসির মতে, লক্ষ্য বিশাল হলেও শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে, জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওয়ালি নাসর মনে করেন, ইরানের প্রধান লক্ষ্য এখন শাসনতন্ত্র টিকিয়ে রাখা, তারা ধীরে ধীরে অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে।
এই চুক্তিতে সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট পক্ষ হলো ইসরায়েল। যুদ্ধের অন্যতম অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও শান্তি প্রক্রিয়ার মূল আলোচনায় ইসরায়েলকে রাখা হয়নি। ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে আড়ালে বা প্রকাশ্যে উত্তেজনা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
পরিশেষে, ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য এবং হাজারো ইরানি নাগরিকের প্রাণহানির পর এই যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো—যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত বড় লক্ষ্যগুলোর একটিও সম্পূর্ণ অর্জন করতে পারেনি। ট্রাম্প হয়তো মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধবিরতি দেখিয়ে নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতে চাইছেন, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এবং ইরানের পারমাণবিক ঝুঁকির অবসান এখনো অমীমাংসিত। সামরিক শক্তি দিয়ে যে সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব হয়নি, যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত সেই কূটনীতির পথেই ফিরতে হচ্ছে—আর এই বাস্তবতাই ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

