ইউক্রেনে যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। কূটনৈতিক তৎপরতা এবং শান্তি আলোচনার নানা উদ্যোগ চললেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বরং সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হামলার তীব্রতা আরও বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া শহরে নতুন করে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে রাশিয়া, যাতে অন্তত পাঁচজন নিহত এবং আরও ১১ জন আহত হয়েছেন।
২০ জুন জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে পরিচালিত এই হামলার পর স্থানীয় প্রশাসন জানায়, শহরের বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় অনেক স্থানে ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে এবং উদ্ধারকর্মীরা সেখানে আটকে পড়া মানুষের সন্ধানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার আগে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের গভর্নর ইভান ফেদোরভ জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য জরুরি সেবা স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে দ্রুত মাঠে নামানো হয়েছে। হামলার পর পুরো এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে। যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার অগ্রগতি থেমে যাওয়ার ফলে উভয় পক্ষই আবার সামরিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। এর ফল হিসেবে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বসবাসের এলাকাও বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
জাপোরিঝঝিয়ার হামলার কিছু সময় পরই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর খারকিভেও নতুন হামলার খবর পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে একটি নির্দেশিত বিমান বোমা আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে। হামলায় একজন নিহত এবং নয়জন আহত হন। বিস্ফোরণের পর কয়েকজন মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। উদ্ধারকারীরা অভিযান চালিয়ে পরে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেন।
খারকিভের মেয়র ইহোর তেরেখভ জানিয়েছেন, হামলার ফলে আশপাশের ভবনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক বাসিন্দা আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে বাধ্য হন। যুদ্ধের শুরু থেকে একাধিকবার হামলার শিকার হওয়া এই শহরটি আবারও নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হলো।
এদিকে দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলেনিভকা এলাকায় চালানো একটি ড্রোন হামলায় ৭২ বছর বয়সী এক নারী আহত হয়েছেন। যদিও এই হামলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি, তবুও এটি দেখিয়ে দেয় যে সংঘাতের প্রভাব এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমানভাবে বিস্তৃত রয়েছে।
যুদ্ধ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামরিক সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তির সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ। উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা, পাল্টা হামলা এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে।
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই সংঘাত ইউক্রেনের অবকাঠামো, অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। লাখো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে, অসংখ্য পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এখনো নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। সর্বশেষ জাপোরিঝঝিয়া ও খারকিভের হামলা আবারও মনে করিয়ে দিল, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য এখনো সাধারণ মানুষকেই দিতে হচ্ছে।
শান্তি আলোচনা যত দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকবে, ততই বাড়বে মানবিক সংকটের গভীরতা। আর সেই বাস্তবতার মধ্যেই প্রতিদিন নতুন অনিশ্চয়তা ও ভয় নিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে ইউক্রেনের লাখো মানুষকে।

