দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার দেশ বলিভিয়া নতুন এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। টানা ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
বলিভিয়ার বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত কয়েক মাস ধরে দেশটিতে অর্থনৈতিক সংস্কার, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। সেই ক্ষোভ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বৃহৎ আন্দোলনে। শ্রমিক সংগঠন, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং কোকা চাষিদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা শুধু মিছিল বা সমাবেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে ইট, পাথর, কাঠ ও অন্যান্য প্রতিবন্ধক বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে রাজধানী লা পাজসহ বিভিন্ন শহরে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বলিভিয়ার অর্থনীতিকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে এটি দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সরকারের পতনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে শনিবার ভোরে জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে ভাষণ দেন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ। ভাষণে তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন এবং ৯০ দিনের জরুরি অবস্থা জারি করেন। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনসমাবেশ ও বিক্ষোভের ওপরও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে মোতায়েন করা হয়। এল আল্টো শহরে সড়ক অবরোধ সরাতে বুলডোজার ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর বড় বহর অবস্থান নেয়।
তবে পরিস্থিতির একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে। দীর্ঘদিনের অবরোধে দুর্ভোগে থাকা সাধারণ মানুষের একটি অংশ সেনা মোতায়েনকে স্বাগত জানিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সরকারের এই পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
এল আল্টোর একজন দোকানি কার্লা বুত্রন বলেন, টানা ৫০ দিনের বেশি সময় ধরে ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবন প্রায় স্থবির হয়ে ছিল। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগে তিনি সন্তুষ্ট।
অন্যদিকে রাজধানী লা পাজের চিত্র ভিন্ন। সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ঘিরে রাখা হয়েছে নৌবাহিনী ও সামরিক পুলিশের সদস্যদের দ্বারা। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোতায়েন রয়েছে বিশেষ পুলিশ ইউনিট।
প্রেসিডেন্ট পাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, সড়ক অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষ কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না, কর্মজীবীরা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছে না এবং চিকিৎসাসেবা পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে। তার ভাষায়, জরুরি অবস্থার উদ্দেশ্য জনগণের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়, বরং স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু আন্দোলনকারীরা এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাদের মূল দাবি একটিই—প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজকে পদত্যাগ করতে হবে। মাত্র এক বছরেরও কম সময় আগে ক্ষমতায় আসা এই নেতা যে উদার অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি চালু করেছেন, তার বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
সংকট নিরসনের জন্য সরকার কিছুটা নমনীয় হওয়ারও চেষ্টা করেছে। চলতি সপ্তাহে দেশের অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছায় সরকার। সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে শ্রমিক সংগঠনটি আন্দোলন থেকে সরে আসতে সম্মত হয়।
তবে এতে সংকটের সমাধান হয়নি। অনেক আদিবাসী সংগঠন এখনও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে দেশের অন্তত ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে অবরোধ অব্যাহত রয়েছে।
আদিবাসী নেত্রী লিডিয়া ক্যালিসায়া স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তাদের লক্ষ্য সরকার পরিবর্তন। তার মতে, বর্তমান প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা শেষ হয়ে গেছে।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসকে ঘিরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। প্রেসিডেন্ট পাজ সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, চলমান বিক্ষোভের পেছনে মোরালেস এবং তার সমর্থকদের ভূমিকা রয়েছে। এমনকি তিনি কিছু গোষ্ঠীকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
ইভো মোরালেস বলিভিয়ার ইতিহাসে প্রথম আদিবাসী প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ২০০৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এক নাবালিকাকে পাচারের অভিযোগ রয়েছে, যদিও তিনি সেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
মোরালেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চাপারে অঞ্চল এখন সম্ভাব্য সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সেখানে হাজার হাজার সমর্থক তাকে ঘিরে অবস্থান করছে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনী চাইলে সহজে অভিযান চালাতে পারছে না।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো আন্তোনিও ওভিয়েডো ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে মোরালেসকে আইনের আওতায় আনতে সরকার ব্যবস্থা নেবে।
অন্যদিকে আত্মগোপনে থাকা মোরালেস পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, বর্তমান সরকার দেশের স্বার্থের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তার দাবি, জনগণের ক্ষোভ মূলত সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে।
সব মিলিয়ে বলিভিয়া এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা—যে কোনো পথই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। আপাতত সেনাবাহিনী রাস্তায়, অবরোধ আংশিকভাবে সরানো শুরু হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের সমাধান এখনও অনেক দূরে। আগামী কয়েক দিনই বলে দেবে বলিভিয়া স্বাভাবিকতার পথে ফিরবে, নাকি আরও গভীর অস্থিরতার দিকে এগিয়ে যাবে।

