ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার ইতিহাসে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে পানি নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা। কাশ্মীর, সীমান্ত কিংবা সন্ত্রাসবাদ ইস্যুর বাইরে এবার দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর সম্পর্কে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সিন্ধু নদীর পানি। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের সাম্প্রতিক মন্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে এবং পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে ভারতবিরোধী সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করা হবে। তার ভাষায়, পানি এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে কয়েক মাস ধরে চলা এক কূটনৈতিক টানাপোড়েন। গত এপ্রিল মাসে পাহেলগামে সংঘটিত ভয়াবহ হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত ১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক সিন্ধু নদ জলচুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। নয়াদিল্লির দাবি, সীমান্তপারের সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংসে পাকিস্তান দৃশ্যমান ও নির্ভরযোগ্য পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
সিন্ধু নদ জলচুক্তিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল আন্তর্জাতিক পানি বণ্টন চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান সিন্ধু অববাহিকার প্রায় ৮০ শতাংশ পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে থাকে। ফলে চুক্তিটি পাকিস্তানের কৃষি অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাকিস্তানের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সেচ অবকাঠামোর অব্যবস্থাপনা, পানি অপচয় এবং পরিকল্পনার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম খালে ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ, রাইস খালে ৩৮ শতাংশ এবং দাদু খালে ৮২ শতাংশ পর্যন্ত পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সিন্ধু ও বেলুচিস্তান প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পানি সংকট ইতোমধ্যে জনজীবন ও কৃষিকে চাপে ফেলেছে।
খাজা আসিফ অভিযোগ করেছেন, ভারত পানি প্রবাহকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে এবং চেনাব নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে একই সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন যে, গত এক বছরে ভারতের প্রকল্পগুলোতে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, সে বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। ফলে তার অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সংকট নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ায় পানি নিরাপত্তা নিয়ে ভবিষ্যৎ উদ্বেগেরও প্রতিফলন। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পানির চাহিদা বাড়ার ফলে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পানি বণ্টন নিয়েও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান সংকটের বড় অংশের জন্য ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নীতিগত ব্যর্থতা বেশি দায়ী। সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পানি সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ফলে ভারতকে লক্ষ্য করে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি রাজনৈতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এলেও বাস্তবে সংকটের সমাধান সামরিক পথে নয়, বরং কূটনৈতিক সংলাপ, আস্থা পুনর্গঠন এবং কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যেই নিহিত বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণও হয়ে উঠতে পারে।

