চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আবারও নতুন উত্তেজনার মুখে পড়েছে। একদিকে দুই দেশ প্রকাশ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার কথা বলছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও বিরল খনিজ সম্পদ ঘিরে পারস্পরিক চাপ বাড়াচ্ছে। এই টানাপোড়েনের সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে বেইজিং ১০টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। একই সঙ্গে চীনের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ৪৬টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের পণ্য কেনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আজ সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, চীন সরকার এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। চীনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি চীনের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করেছে। তার জবাবেই বেইজিং এই পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। চীনের ভাষায়, এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে।
ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে রয়েছে বড় শক্তিগুলোর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, সামরিক সক্ষমতা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে বিরল খনিজ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং দ্বৈত ব্যবহারের পণ্য এখন দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত চাপের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১০টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কাছে দ্বৈত ব্যবহারের সামগ্রী সরবরাহ করা যাবে না। দ্বৈত ব্যবহারের সামগ্রী বলতে এমন পণ্য, প্রযুক্তি বা উপকরণকে বোঝায়, যা বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা গেলেও সামরিক ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। এ ধরনের পণ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের ওপর চাপ তৈরি করতে চাইছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাভিওক্স, যার সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মহাকাশ প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। তালিকায় আছে ওশকোশ ডিফেন্স, যারা সামরিক যানবাহন তৈরি করে। এ ছাড়া মার্কিন বিরল খনিজ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এমপি মেটেরিয়ালস ও ইউএসএ রেয়ার আর্থও এই নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়েছে।
বিরল খনিজ এই বিরোধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত ব্যাটারি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরিতে বিরল খনিজের ভূমিকা বড়। বিশ্ববাজারে এই খাতের ওপর চীনের প্রভাব দীর্ঘদিনের। তাই বেইজিং যখন বিরল খনিজ সংশ্লিষ্ট মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ দেয়, তখন সেটি শুধু প্রতীকী সিদ্ধান্ত থাকে না; এর কৌশলগত বার্তাও থাকে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চলমান যেকোনো রপ্তানি কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। শুধু চীনের ভেতরের রপ্তানিকারক নয়, যেকোনো দেশ বা অঞ্চলের এমন সংস্থা বা ব্যক্তিও এই বিধিনিষেধের আওতায় পড়বে, যারা চীনে উৎপাদিত দ্বৈত ব্যবহারের সামগ্রী ওই তালিকাভুক্ত মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে স্থানান্তর বা সরবরাহ করবে।
এই অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে চীন শুধু নিজ দেশের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং চীনা উৎসের পণ্য বা উপকরণের আন্তর্জাতিক প্রবাহও নিয়ন্ত্রণের বার্তা দিচ্ছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
চীনের এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র চলতি মাসে ৮০টি কোম্পানি ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান চীনা সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করছে। ওই তালিকায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলিবাবা ও বাইদুর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডির নামও রয়েছে। চীনের দৃষ্টিতে এটি ছিল সরাসরি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ।
বেইজিং এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত আপত্তিকর বলে অভিহিত করেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত চীনা সামরিক প্রতিষ্ঠান তালিকায় চীনা কোম্পানির নাম যুক্ত করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনে নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় আলাদা ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারি ক্রয়ের সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলো ৪৬টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের তৈরি পণ্য কিনতে পারবে না। এই তালিকায় রয়েছে লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন এবং বোয়িংয়ের প্রতিরক্ষা বিভাগ। আরও আছে জেনারেল ডাইনামিকস ও অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিভাগ। কয়েকটি মহাকাশ গবেষণা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে।
তবে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ও রেখেছে। চীনে ব্যবসা পরিচালনাকারী মার্কিন বিনিয়োগযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে। অর্থাৎ বেইজিং এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে রাজনৈতিক বার্তা শক্তিশালী থাকে, কিন্তু চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরাসরি বড় ধাক্কা না পড়ে।
এই ব্যবস্থা আজ সোমবার থেকেই কার্যকর হয়েছে। এর ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীন উৎসের নির্দিষ্ট পণ্য ও উপকরণ পাওয়ার পথ আরও কঠিন হতে পারে। যদিও অনেক বিশ্লেষকের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগের চীনের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত। তবু সিদ্ধান্তটি প্রতীকী ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনা কোম্পানির ওপর চাপ বাড়ায়, চীনও পাল্টা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।
এই সংঘাতের আরেকটি বড় প্রেক্ষাপট হলো তাইওয়ান। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে তা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি। অন্যদিকে তাইওয়ান বেইজিংয়ের চাপ মোকাবিলায় অনেকটাই ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। এই কারণে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি চীন–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির জেরে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অর্থাৎ আজকের সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা নীতির ধারাবাহিকতা।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই মাসে জানিয়েছেন, তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজ পর্যালোচনার অধীন রয়েছে। এই ঘোষণা বেইজিংয়ের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। কারণ চীনের দৃষ্টিতে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা সরাসরি চীনের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।
তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই উত্তেজনা এমন সময় বাড়ছে, যখন কিছুদিন আগেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের এক মাস পরই এই পাল্টা পদক্ষেপ এল। সেই সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং দুই দেশের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ককে কিছুটা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন।
দুই দেশ শুল্ক কমানোর লক্ষ্যে কাজ করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা তাদের সম্পর্ককে আবার কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক আলোচনায় আপাত নমনীয়তা থাকলেও নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি ইস্যুতে কেউই ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
ট্রাম্প মে মাসে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর জনসমক্ষে চীন–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি শক্তিশালী ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। গত সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সাত দেশের জোটের সম্মেলনে তিনি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার জন্য চীনের নেতাকে ধন্যবাদ জানান। এই বক্তব্যে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন সব ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সঙ্গে সংঘাত বাড়াতে চায় না। কিন্তু বাস্তবে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমছে না।
চীনের নতুন সিদ্ধান্তকে তাই দুইভাবে দেখা যায়। প্রথমত, এটি যুক্তরাষ্ট্রের কালোতালিকা নীতির সরাসরি জবাব। দ্বিতীয়ত, এটি একটি সতর্কবার্তা—চীনের হাতে এখনো এমন কিছু কৌশলগত উপকরণ আছে, যা ব্যবহার করে সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে চাপের মুখে ফেলতে পারে।
এই পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কারণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানের চীনের সঙ্গে সরাসরি বড় ব্যবসা নাও থাকতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব হতে পারে বেশি গভীর। যদি দুই দেশ পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা বাড়াতে থাকে, তবে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বিভক্ত হতে পারে। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোও প্রভাবিত হতে পারে।
বিশেষ করে বিরল খনিজ ও দ্বৈত ব্যবহারের সামগ্রী ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়লে প্রতিরক্ষা শিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি উৎপাদন, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং মহাকাশ খাতের ব্যয় বাড়তে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হবে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে দামের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
চীন এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বোঝাতে চাইছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে না; বেইজিংও নিজের অর্থনৈতিক শক্তি ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকে ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বার্তাটি হলো, চীনা কোম্পানির ওপর চাপ বাড়ালে মার্কিন প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও পাল্টা চাপের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ২২ জুন ২০২৬–এর এই সিদ্ধান্ত চীন–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন একটি অধ্যায়কে সামনে এনেছে। এটি কেবল ১০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের পণ্য ক্রয় নিষিদ্ধ করার ঘটনা নয়। এটি বড় শক্তির প্রতিযোগিতায় সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রযুক্তি, খনিজ সম্পদ ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে ব্যবহারের স্পষ্ট উদাহরণ।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পদক্ষেপ দুই দেশকে নতুন আলোচনার দিকে ঠেলে দেবে, নাকি আরও কঠোর পাল্টাপাল্টি সিদ্ধান্তের পথে নিয়ে যাবে। আপাতত যে বিষয়টি পরিষ্কার, তা হলো—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থিতিশীল করার কূটনৈতিক ভাষা থাকলেও বাস্তব মাঠে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।

