লেবাননে চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার পর ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তেহরান যদি দ্রুত এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তাহলে ইরানকে গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি ইরানের উদ্দেশে বলেন, হরমুজ বন্ধের নির্দেশ প্রত্যাহার না করলে দেশটি ভয়াবহ মূল্য দেবে। এমনকি বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত ইরানি আলোচক দলও দেশে ফিরতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে লেবাননের পরিস্থিতি। ইরানের দাবি, সাম্প্রতিক সমঝোতার অন্যতম শর্ত ছিল লেবাননে যুদ্ধ ও হামলা বন্ধ করা। কিন্তু দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় তারা প্রতিবাদ হিসেবে শনিবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করে দেয়। তেহরানের মতে, চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের এই পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে হরমুজকে অবরুদ্ধ করার অধিকার ইরানের নেই। তিনি আরও বলেন, যদি কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও একটি বিতর্কিত প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে এই জলপথ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল বা কর আদায় করা হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজে বহন করা পণ্যের বাজারমূল্যের ২০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হতে পারে।
এই প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুটগুলোর একটি নিরাপদ রাখতে ওয়াশিংটনের যে অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যয় হচ্ছে, তার একটি অংশ ফেরত পাওয়ার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরান থেকে আসে কড়া প্রতিক্রিয়া। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। তিনি সতর্ক করে দেন, ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী যেকোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক হুমকির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে এই সংকট এমন এক সময়ে দেখা দিল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে একটি সম্ভাব্য স্থায়ী শান্তি চুক্তির কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছেন। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পর এটি দুই পক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা নয়; এটি পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে সুইজারল্যান্ডে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে হরমুজ ও লেবানন ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি হুমকি উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সফল হবে, নাকি নতুন করে সংঘাতের দিকে পরিস্থিতি মোড় নেবে—সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

