রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে শুধু কামান, ক্ষেপণাস্ত্র বা মানববিহীন আকাশযানের লড়াই চলছে না। এর চেয়েও নীরব, অদৃশ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে বেশি ভয়ংকর একটি যুদ্ধ চলছে রুশ-দখলকৃত ইউক্রেনের শহর, গ্রাম, বাজার, হাসপাতাল, স্কুল ও সরকারি কার্যালয়ের ভেতরে। সেখানে সাধারণ মানুষের মুখোশের আড়ালে কাজ করছে এক বিস্তৃত প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক, যার বড় অংশই নারী। তারা কেউ চিকিৎসাকর্মী, কেউ শিক্ষক, কেউ সরকারি কার্যালয়ের কর্মী, কেউ স্বেচ্ছাসেবী, কেউ আবার নিছক বাজারে যাতায়াত করা একজন বৃদ্ধা। কিন্তু তাদের কারও হাতে থাকা তথ্যই কখনো কখনো রুশ বাহিনীর ঘাঁটি, গোলাবারুদের মজুত, কমান্ড পোস্ট কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত নামিয়ে আনছে।
ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ এক সময় ছিল প্রকাশ্য প্রতিবাদ, পতাকা ও দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে দৃশ্যমান সাহসের প্রকাশ। কিন্তু রাশিয়ার দখল দীর্ঘস্থায়ী হতে থাকলে সেই প্রতিরোধের ধরন বদলে যায়। এখন প্রকাশ্য প্রতিবাদ নয়, বরং তথ্য সংগ্রহ, অবস্থান যাচাই, গোপন যোগাযোগ এবং সামরিক লক্ষ্য শনাক্ত করাই হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের মূল শক্তি।
এই পরিবর্তনের কারণ স্পষ্ট। রুশ-দখলকৃত এলাকায় ইউক্রেনের প্রতি সামান্য সহানুভূতিও ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। স্থানীয়দের ভাষায়, এমন সন্দেহ হলে মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘তলঘরে’—যা আসলে জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন ও ভয় দেখানোর জায়গা। শহরের কেন্দ্রে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নজরদারি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল পিছু পিছু অনুসরণ করা যায়। মারিউপোলের প্রতিরোধ-সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ধারণা, সেখানকার প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককে রুশ নিরাপত্তা সংস্থা মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে মারিউপোলে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল যে নীল ও হলুদ রঙ পর্যন্ত কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সাহায্যসামগ্রীর বাক্স থেকে নীল-হলুদ রঙের কলম সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও স্থানীয়রা বর্ণনা করেছেন।
এই দমননীতির মধ্যেই ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ আরও গোপন, সংগঠিত ও কার্যকর হয়েছে। আগে যেখানে সাধারণ মানুষ রাস্তায় জাতীয় পতাকা ওড়াত, এখন সেখানে প্রশিক্ষিত বা অভিজ্ঞতালব্ধ কর্মীরা দখলদার বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করছেন। তারা সরাসরি বড় দলে কাজ করেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন কর্মী একাই কাজ করেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকে দখলমুক্ত ইউক্রেনের কোনো পরিচালকের। এই বিচ্ছিন্ন কাঠামোর উদ্দেশ্য একটাই—কেউ ধরা পড়লেও যেন পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে না যায়। একজন নারী কর্মীর ভাষায়, যা জানা নেই, তা জিজ্ঞাসাবাদে ফাঁসও করা যায় না।
এই প্রতিরোধের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নারীদের ভূমিকা। দখলকৃত এলাকায় অনেক নারী এমন জায়গায় কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ বা চলাচল বেশি সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হতে পারে। হাসপাতাল, স্কুল, ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের কার্যালয়—এসব জায়গা দখলদার বাহিনীর গতিবিধি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রুশ সৈন্যরা অনেক সময় ধরে নেয়, নারী মানেই অযোদ্ধা, বৃদ্ধা মানেই নিরীহ, দোকানে যাওয়া মানুষ মানেই সাধারণ নাগরিক। ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ এই ভুল ধারণাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
রুশ বাহিনীর নিজের ভেতর থেকেও তথ্য বের করে আনার ঘটনা আছে। প্রতিবেদনে এক চেচেন কমান্ডার আখমাদের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দখলকৃত দক্ষিণ ইউক্রেনে অবস্থান করছিলেন। কয়েক মাস ধরে তিনি বার্তা বিনিময় করেছিলেন এমন একজনের সঙ্গে, যাকে তিনি ৩৫ বছর বয়সী এক নিঃসঙ্গ ইউক্রেনীয় গৃহবধূ মনে করেছিলেন। কথোপকথন চলতে থাকে ব্যক্তিগত জীবন, যুদ্ধশেষের আশা এবং সামনের সারির পরিস্থিতি নিয়ে। একপর্যায়ে তিনি নিজের ব্যারাকের ভেতর থেকে একটি ছবি পাঠান। ছবির পেছনে দেয়ালে থাকা মানচিত্রে তার ইউনিটের অবস্থান বোঝা যায়। কিন্তু সেই ‘গৃহবধূ’ বাস্তবে ছিলেন না। চরিত্রটির আড়ালে ছিলেন সেরহি নামের মধ্যবয়সী এক ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। পরে সেই ছবির সূত্রে শনাক্ত হওয়া অবস্থানে ইউক্রেনীয় আঘাত হানে।
এই ঘটনা শুধু কৌতূহল জাগানোর মতো নয়; এটি আধুনিক যুদ্ধের একটি গভীর বাস্তবতা দেখায়। যুদ্ধ এখন শুধু ভূখণ্ড দখলের বিষয় নয়, তথ্য দখলেরও বিষয়। ভুল হাতে চলে যাওয়া একটি ছবি, অসতর্কভাবে বলা একটি কথা, অবস্থান বোঝা যায় এমন একটি পটভূমি—এসবই সামরিক পরিণতি তৈরি করতে পারে। ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ বুঝেছে, রুশ বাহিনীর শারীরিক শক্তি যতই বড় হোক, তাদের মানবিক দুর্বলতা, আত্মবিশ্বাস, অসতর্কতা এবং একাকিত্ব কাজে লাগানো সম্ভব।
রুশ সামরিক যন্ত্র অনেক জায়গায় নির্মম ও ভারী হলেও তাদের বৈদ্যুতিক নজরদারি ও যোগাযোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জুন ২০২২ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় মোবাইল সেবাদাতা কিয়েভস্টার ও ভোডাফোন দখলকৃত এলাকায় চালু ছিল, কারণ তখনও রাশিয়া নিজস্ব কাঠামো পুরোপুরি দাঁড় করাতে পারেনি। পরে সেই নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিরোধকর্মীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বদলাতে হয়। দখলকৃত অঞ্চলে কেনা ফোন প্রতিরোধের কাজে প্রায় অকার্যকর বলে বিবেচিত হয়, কারণ সেগুলোতে রুশ গোয়েন্দাদের নজরদারি ব্যবস্থা থাকতে পারে। চেকপয়েন্টে রুশ সৈন্যরা ফোন পরীক্ষা করে। আবার গোপন বার্তা আদানপ্রদানের অ্যাপ থাকলেও সেটি সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতা প্রতিরোধকে আরও সতর্ক করেছে। তারা প্রকাশ্য বা সহজ যোগাযোগের ওপর নির্ভর না করে এমন কাঠামো তৈরি করেছে, যা ঝুঁকি কমায়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষণ সামগ্রী কাগজে ছাপিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে দুর্বল ডিজিটাল পথে ধরা পড়ার ভয় কম থাকে। এমনকি জনপ্রিয় বইয়ের ভেতরে নির্দেশনা লুকিয়ে পাঠানোর কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। এই তথ্যগুলো দেখায়, ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ শুধু সাহসের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি অভিযোজন, বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের ওপরও দাঁড়িয়ে আছে।
নারী প্রতিরোধকর্মীদের একটি অংশকে ইউক্রেনীয় লোককথার ভাষায় ‘বিদমা’ বলা হয়। শব্দটির কাছাকাছি অর্থ ‘ডাইনি’ হলেও ইউক্রেনীয় প্রেক্ষাপটে এর মানে ভিন্ন। এটি এসেছে জানা বা বোঝার ধারণা থেকে। ইউক্রেনীয় সংস্কৃতিতে এই চরিত্রগুলোকে জ্ঞানী, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন এবং রহস্য বোঝার ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে দেখা হয়। সেই অর্থেই দখলভূমির নারী গোয়েন্দাদের ‘বিদমা’ বলা হচ্ছে—কারণ তারা জানেন, দেখেন, মনে রাখেন এবং সময়মতো তথ্য পৌঁছে দেন।
২০১৪ সালে রাশিয়ার প্রথম আঘাতের পর ইউক্রেনীয় উইমেন্স গার্ড নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নারীদের আত্মরক্ষা ও দখল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে। ২০২২ সালের মধ্যে ৬০,০০০-এর বেশি অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। অধিকাংশ প্রশিক্ষণ ছিল আত্মরক্ষা ও বেঁচে থাকার কৌশল নিয়ে, তবে কিছু প্রশিক্ষণ দখল পরিস্থিতিতে নজরদারি এড়ানো, তথ্য সংগ্রহ এবং মানসিক চাপ সামলানোর মতো বিষয়েও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এসব প্রশিক্ষণ প্রমাণ করে, ইউক্রেনীয় সমাজে যুদ্ধ শুধু সেনাবাহিনীর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি; নাগরিক সমাজও নিজেকে প্রতিরোধের অংশ হিসেবে প্রস্তুত করেছে।
প্রবাসী ইউক্রেনীয়রাও এই প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছেন। দখলকৃত এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়া মানুষদের অনেকেই নিজেদের গ্রাম, রাস্তা, খামার, গুদাম বা সরকারি স্থাপনা খুব ভালোভাবে চেনেন। ফলে ভেতর থেকে পাওয়া তথ্য তারা বাইরে বসে যাচাই করতে পারেন। রোকসানা নামে পরিচয় গোপন রাখা এক নারী খেরসনের কাছে দনিপ্রো নদীর দক্ষিণ তীরে একটি ক্লিনিকে কাজ করতেন। রুশ সামরিক বাহিনীর জন্য কাজ করতে অস্বীকার করার পর তিনি প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান। এখন বিদেশে বসে তিনি ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের লক্ষ্য যাচাইয়ে সহায়তা করেন। তার বক্তব্যের মূল কথা হলো, তিনি নিজের গ্রামকে রাস্তা, খামার, গুদামসহ প্রতিটি অংশে চেনেন।
এই প্রতিরোধের পেছনে শুধু দেশপ্রেম নয়, গভীর ক্ষতও কাজ করছে। রোকসানা বলেন, আক্রমণের প্রথম কয়েক সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায় লাশের খবর শোনা যেত। নারীদের ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতার অভিযোগও উঠে আসে। কিয়েভের একটি বড় হাসপাতালের নারী কেন্দ্রের চিকিৎসক তেতিয়ানা কোস্তিয়ানতিনিভনা জানান, ২০২২ ও ২০২৩ সালে দখলকৃত এলাকা থেকে আসা যৌন সহিংসতার বেঁচে থাকা মানুষদের ধারাবাহিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে; তাদের বয়স ছিল ৪ থেকে ৭৫ বছরের মধ্যে। এই তথ্য যুদ্ধের নিষ্ঠুর মানবিক মূল্য সামনে আনে। প্রতিরোধ তাই অনেকের কাছে শুধু সামরিক কাজ নয়, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, ন্যায়বিচার ও বেঁচে থাকার লড়াই।
রোকসানার নিজের পালানোর পথও ছিল ভয়ংকর। তিনি ৩৩টি রুশ চেকপয়েন্ট পার হয়েছিলেন। কয়েকটি জায়গার আশপাশে লাশ পড়ে ছিল। এক চেকপয়েন্টে রুশ সৈন্য তার গাড়ির পেছনে গুলি চালায় এবং এক যাত্রীর পায়ে আঘাত লাগে। এমন অভিজ্ঞতার পর তিনি আজ নিজের গ্রামের ভেতর রুশ অবস্থানে আঘাত হানার তথ্য যাচাই করতেও দ্বিধা করেন না, যদি তাতে দখলদার বাহিনীকে তাড়ানো যায়। তার যুক্তি কঠোর: গুদামঘর ধ্বংস হলে আবার বানানো যাবে, কিন্তু দখলদার সৈন্যদের ক্ষয়ক্ষতি তাদের যুদ্ধক্ষমতাকে সরাসরি কমায়।
শিশুরাও যুদ্ধের প্রথম দিকে প্রতিরোধে ভূমিকা রেখেছিল বলে প্রতিবেদনে এসেছে। তারা চেকপয়েন্ট পার হতে পারত, দ্রুত নতুন যোগাযোগ পদ্ধতি শিখত এবং অনেক সময় অবিশ্বাস্য সাহস দেখাত। কিন্তু ঝুঁকি ছিল ভয়ংকর। ইউক্রেনপন্থী কোনো পোস্টে পছন্দের চিহ্ন দেওয়া বা সামাজিক মাধ্যমে ভুল কিছু প্রকাশ করাও শিশুকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ফেলতে পারত। খেরসনের কাছে দখলকৃত এক গ্রামের এক মেয়ের ঘটনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে ১১ বছর বয়সে রুশ বাহিনীর হাতে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তোতলাতে শুরু করে। প্রতিরোধ নেতৃত্ব এখন শিশুদের অংশগ্রহণে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলে। তাদের যুক্তি, শিশুদের ঝুঁকি শুধু ব্যক্তিগত নয়; পুরো ইউনিটের মনোবল ও নিরাপত্তার ওপরও তা আঘাত করে।
তবু বাস্তবতা জটিল। কিছু দখলকৃত শহরে কিশোররা রুশ নজরদারি এড়িয়ে ইউক্রেনীয় পরিচয়ের ছোট ছোট চিহ্ন রেখে যায়। আগে তারা নীল-হলুদ রঙ ব্যবহার করত; এখন ঝুঁকি বাড়ায় কোথাও কোথাও ইউক্রেনীয় বর্ণ আঁকে বা আঁচড় কাটে। কিন্তু প্রতিরোধ নেতারা এটিও নিরুৎসাহিত করছেন। তাদের মতে, একটি দেয়াললেখা শিশুর জন্য নির্যাতন, আটক, রাশিয়ায় নির্বাসন বা পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ডেকে আনতে পারে। তারা এখন শিল্প নয়, তথ্য চায়; কারণ তথ্যই দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর অস্ত্র।
প্রতিরোধের শেষ প্রান্তে রয়েছে মানববিহীন আকাশযান পরিচালনাকারীরা। ইউক্রেনের ৪২৬তম মানববিহীন ব্যবস্থা রেজিমেন্টের এক কোম্পানি কমান্ডার ইগর ক্রাভচেঙ্কো, যার ডাকনাম ‘রাম’, জানান, তার ইউনিট প্রতি রাতে দখলকৃত এলাকায় আঘাত হানতে মানববিহীন আকাশযান পাঠায়, এবং এসব অভিযানের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিরোধের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে। উচ্চ অগ্রাধিকারের লক্ষ্য—যেমন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড পোস্ট বা গোলাবারুদের মজুত—চিহ্নিত হলে তথ্য পাঠানো থেকে আঘাত হানা পর্যন্ত সময় কখনো ১৫ মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমিত থাকতে পারে।
এই গতিই ইউক্রেনীয় প্রতিরোধকে আলাদা করেছে। আগে প্রতিরোধ ছিল প্রতীকী সাহসের প্রকাশ; এখন তা সামরিক ফল তৈরির যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দখলভূমির ভেতর থেকে আসা তথ্য, বাইরে থাকা স্থানীয় জ্ঞানসম্পন্ন প্রবাসীদের যাচাই, সামরিক গোয়েন্দাদের সমন্বয় এবং মানববিহীন আকাশযানের আঘাত—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক নতুন ধরনের যুদ্ধচক্র। এখানে একজন বৃদ্ধার দেখাশোনা, একজন চিকিৎসাকর্মীর স্মৃতি, একজন শিক্ষককের যাতায়াত বা একজন অনলাইন কথোপকথনকারী ছদ্মপরিচয়—সবই সামরিক মানে বহন করতে পারে।
এই লড়াইয়ের রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট। ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ বিশ্বকে জানাতে চায়, দখল মানেই আত্মসমর্পণ নয়। রুশ বাহিনী কোনো শহর দখল করলেও সেখানে মানুষের আনুগত্য দখল করতে পারেনি। বরং দখল যত দীর্ঘ হয়েছে, প্রতিরোধ তত বেশি নীরব, পেশাদার ও প্রাণঘাতী হয়েছে। প্রতিরোধকর্মীদের বক্তব্য হলো, দখলকৃত ভূমি ছেড়ে দেওয়া কোনো স্থায়ী শান্তির পথ নয়; কারণ বুচা, খেরসন ও মারিউপোলের অভিজ্ঞতা তাদের কাছে ‘শান্তি’ শব্দটিকে গভীরভাবে সন্দেহজনক করে তুলেছে।
এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আধুনিক যুদ্ধে ক্ষমতার মাপ শুধু ট্যাংক, গোলাবারুদ বা সৈন্যসংখ্যায় হয় না। ক্ষমতার আরেক নাম তথ্য। যে পক্ষ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারে, শত্রুর আত্মবিশ্বাস ভাঙতে পারে এবং দখলভূমির সাধারণ মানুষকে প্রতিরোধের অংশে পরিণত করতে পারে—সে পক্ষ দুর্বল হয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলে নারীদের নেতৃত্বাধীন এই গোপন প্রতিরোধ সেই বাস্তবতারই এক নির্মম উদাহরণ।
রাশিয়ার জন্য এই প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, শত্রু কে তা বোঝা কঠিন। বাজারের বৃদ্ধা, ক্লিনিকের চিকিৎসাকর্মী, স্কুলের কর্মচারী, ত্রাণসেবী, বাসচালক বা রাস্তার সাধারণ পথচারী—কারও চোখে হয়তো পরবর্তী আঘাতের তথ্য জমা হচ্ছে। আর ইউক্রেনের জন্য এই নেটওয়ার্ক শুধু সামরিক সহায়তা নয়; এটি দখলের মধ্যেও জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকার প্রমাণ। বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে পতাকা ওড়ানোর দিন হয়তো কমে গেছে, কিন্তু প্রতিরোধ শেষ হয়নি। বরং তা এখন ছায়ার ভেতরে ঢুকে আরও শীতল, আরও হিসাবি, আরও কার্যকর হয়ে উঠেছে।

