সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনার প্রথম দিন শেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অংশ নেওয়া কাতার ও পাকিস্তান জানিয়েছে, দুই দেশ একটি চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোতে আগামী ৬০ দিনের জন্য একটি রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে।
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠককে অনেকেই সম্ভাব্য বড় সমঝোতার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন।
লেক লুসার্নের তীরে প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী চলা বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
নতুন কমিটি ও সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত
বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো একটি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি গঠন। এই কমিটির কাজ হবে পুরো আলোচনা প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা।
একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির মতো বিষয়গুলো নিয়ে পৃথক কর্মদল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে এসব কর্মদল নিয়মিতভাবে উচ্চপর্যায়ের কমিটিকে প্রতিবেদন দেবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো যতটা সহজ, বাস্তব ও কারিগরি পর্যায়ের সমাধান বের করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বহু বছরের অবিশ্বাস এক দিনে দূর হওয়ার নয়।
পারমাণবিক ইস্যুই সবচেয়ে বড় বাধা
আলোচনার সবচেয়ে জটিল অংশ এখনো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান ভবিষ্যতে কতটুকু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে, ইতোমধ্যে মজুত থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হবে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিধি কতটা হবে এবং নিষেধাজ্ঞা কখন ও কীভাবে প্রত্যাহার করা হবে—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় বিতর্ক হতে পারে ইরানের মজুত ইউরেনিয়াম নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এসব মজুতের ওপর আন্তর্জাতিক তদারকি থাকুক। কিন্তু ইরানের মতো একটি দেশের জন্য বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এখানেই সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলাদা যোগাযোগ ব্যবস্থা
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়েও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা সামরিক উত্তেজনা এড়াতে একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজকে ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকার অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
লেবানন নিয়ে নতুন উদ্যোগ
আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল লেবানন। বৈঠকের পর একটি বিশেষ সমন্বয় কাঠামো গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য লেবাননে চলমান সামরিক সংঘাত বন্ধে সহায়তা করা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ করার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নতুন এই ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।
অন্যদিকে পরিস্থিতি এখনো জটিল। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখবে। একই সময়ে ইরানের ঘনিষ্ঠ শক্তিগুলোও ইসরায়েলকে ওই অঞ্চল ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
ফলে কাগজে-কলমে অগ্রগতি হলেও বাস্তবে শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো অনেক দূরের পথ।
নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত
ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে আলোচনার অংশ হিসেবে দেশটির তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে তেহরান জানিয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দাবির পূর্ণ সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানেও বড় বাধা রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং কংগ্রেসের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে জটিল করে তুলতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
সুইজারল্যান্ডের বৈঠক নিঃসন্দেহে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এটিকে এখনই চূড়ান্ত সাফল্য বলা যাবে না।
পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, লেবাননের সংঘাত এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—এই চারটি বড় প্রশ্নের কার্যকর সমাধান ছাড়া স্থায়ী চুক্তি বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন।
তবুও দীর্ঘদিনের শত্রুতা ও সংঘাতের পর দুই দেশ যে আলোচনার টেবিলে বসে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করতে পেরেছে, সেটিই আপাতত সবচেয়ে বড় ইতিবাচক বার্তা। এখন নজর থাকবে আগামী ৬০ দিনের দিকে। এই সময়ের মধ্যেই বোঝা যাবে, মধ্যপ্রাচ্য সত্যিই নতুন এক শান্তির পথে এগোচ্ছে, নাকি আবারও পুরোনো উত্তেজনার চক্রে ফিরে যাচ্ছে।

