ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং পরবর্তী কূটনৈতিক সমঝোতা নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নতুন এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, দেশটির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক বিশ্বাস করেন যে সংঘাতের শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি কৌশলগত ও রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে ইরান। এই ফলাফল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের জন্য নতুন এক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় এবং আগাম ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জরিপে অংশ নেওয়া ৯২ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানই বিজয়ী হয়েছে অথবা অন্তত সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। একই সঙ্গে ৮২ দশমিক ৯ শতাংশের মতে, এই যুদ্ধ ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করেছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই হতাশা শুধু বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে সীমাবদ্ধ নয়। জরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ডানপন্থি ভোটারদের মধ্যেও একই ধরনের মনোভাব প্রবল। তাদের ৯৩ দশমিক ১ শতাংশও মনে করেন, সংঘাতের ফলাফল শেষ পর্যন্ত ইরানের পক্ষেই গেছে।
যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তি নিয়েও ইসরায়েলি সমাজে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ওই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন। বিপরীতে মাত্র ১২ দশমিক ১ শতাংশ নাগরিক চুক্তিটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েলি জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে, আলোচনার টেবিলে ইরান তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে।
যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফল নিয়েও নেতিবাচক মূল্যায়ন সামনে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা যুদ্ধের ফলাফলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন না। আরও ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ মনে করেন, ইসরায়েল হয় ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, নয়তো আংশিক সফল হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বারবার দাবি করে আসছেন যে এই সামরিক অভিযান ইসরায়েলের জন্য বড় সাফল্য এনে দিয়েছে এবং দেশের অস্তিত্বের জন্য সম্ভাব্য হুমকি দূর করতে সহায়তা করেছে। কিন্তু জনমত জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। অংশগ্রহণকারীদের ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এই দাবিতে আস্থা রাখেন না।
নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের মূল্যায়নেও হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, যুদ্ধ পরিচালনায় তার ভূমিকা দুর্বল ছিল অথবা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শুধু একটি সামরিক অভিযানের মূল্যায়ন নয়; বরং বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার মাত্রাও প্রকাশ করছে।
তবে একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের প্রতি সমর্থন এখনও উল্লেখযোগ্য। জরিপে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করা উচিত।
১৭ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে ১৭ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩ হাজার ৬৪৪ জন ইসরায়েলি অংশ নেন। গবেষকদের দাবি, জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেই নমুনা নির্বাচন করা হয়েছে এবং ৯৯ শতাংশ নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ত্রুটির হার মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ।
এই জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে যা-ই ঘটুক না কেন, রাজনৈতিক ও জনমতের লড়াইয়ে এখন কঠিন সময় পার করছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আর ইসরায়েলি জনগণের বড় একটি অংশ বিশ্বাস করছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের শেষ হাসিটা ইরানই হেসেছে।

