যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার মধ্যে নতুন এক কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। একদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর আরোপিত কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরান যদি চুক্তির শর্ত মেনে না চলে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত থাকবে।
সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী শান্তি সমঝোতার ধারাবাহিকতায় সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর এই ঘোষণা আসে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই পক্ষ একটি স্থায়ী চুক্তির পথে এগোনোর জন্য একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া পক্ষগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি লেবাননের সংঘাত কমানোর উদ্যোগ এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার জন্য একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ইরান আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রি করতে পারবে এবং সেই বিক্রির অর্থ গ্রহণের সুযোগও পাবে। দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে চাপে থাকা ইরানের জন্য এটি একটি বড় স্বস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এই ঘোষণার প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির খবর প্রকাশের পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে এবং মূল্যহ্রাসের সেই প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার ফলাফল নিয়ে আশাবাদী মন্তব্য করেছেন। তার মতে, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বৈঠক একটি সফল চূড়ান্ত চুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে। তিনি দাবি করেন, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে এবং বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ও যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
তবে ইরানের বক্তব্য অনেকটাই ভিন্ন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি এবং তেহরান নতুন কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি। এই বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, দুই দেশ এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হতে পারেনি।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনায় অগ্রগতির প্রশংসা করলেও সতর্কবার্তা দিতে ভোলেননি। তিনি বলেন, ইরানকে তাদের পরমাণু কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অস্ত্র পরিদর্শনের সুযোগ দিতে হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, যদি ইরান চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বা গ্রহণযোগ্য আচরণ না করে, তাহলে তিনি যা প্রয়োজন মনে করবেন তাই করবেন। এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, কূটনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও ওয়াশিংটন এখনো তেহরানের প্রতি পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না।
আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ইরানের বিদেশে জব্দ হয়ে থাকা অর্থ। মার্কিন পক্ষের দাবি, এই অর্থ মুক্ত করা হলে তা কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার একটি যৌথ তদারকি কাঠামো গড়ে তুলবে। ভ্যান্স জানিয়েছেন, এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে যাতে মুক্ত হওয়া অর্থের একটি অংশ ভুট্টা, সয়াবিন ও গমের মতো মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ট্রাম্পও একই ধরনের মন্তব্য করে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে যে অর্থ মুক্ত হবে, তার সুফল শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরাই পাবেন। কিন্তু ইরান এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি বলেছেন, ইরানের ওপর এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি এবং মুক্ত হওয়া অর্থ বৈধ ও নিষেধাজ্ঞামুক্ত অন্যান্য পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যাবে।
শুধু ইরান নয়, লেবাননের পরিস্থিতিও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। মার্কিন মিত্র ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত কমানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংঘাতের মাত্রা কিছুটা কমেছে। তবে ইসরায়েল ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের নিরাপত্তা অবস্থান বজায় রাখবে এবং প্রয়োজন মনে করলে সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে আশা ও সংশয় পাশাপাশি অবস্থান করছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া এবং আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক সংকেত দিলেও পরমাণু কর্মসূচি, জব্দ সম্পদের ব্যবহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
আগামী ৬০ দিন তাই শুধু একটি সময়সীমা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই সময়ের মধ্যে যদি দুই পক্ষ আস্থার ভিত্তি আরও শক্ত করতে পারে, তাহলে বহু বছরের সংঘাত ও উত্তেজনার পর একটি নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হতে পারে। আর যদি মতপার্থক্য আরও গভীর হয়, তাহলে বর্তমান অগ্রগতি সাময়িক বিরতি হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।

