যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে নতুন এক অর্থনৈতিক মোড় দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল অঙ্কের সম্পদের একটি বড় অংশ ছাড় দেওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে তেল বিক্রি ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেয়েছে দেশটি।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, জব্দ থাকা ১২ বিলিয়ন ডলার ইরানের কাছে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। এই অর্থ দুই ধাপে ছাড় করা হবে, যেখানে প্রতিটি কিস্তির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলার। তার দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এটি।
তবে পুরো বিষয়টি এমন নয় যে ইরানের ওপর আরোপিত সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। বরং চূড়ান্ত কোনো রাজনৈতিক চুক্তি এখনো না হওয়ায় দেশটির তেল খাতের ওপর মূল নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। তারপরও তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ছাড় পেয়েছে তেহরান, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের খবরকে কেবল আর্থিক সাফল্য নয়, বরং কূটনৈতিক অগ্রগতিরও প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
গালিবাফের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতেও অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নতুন সমন্বয় কাঠামো তৈরির বিষয়ে একমত হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং ভবিষ্যতে সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সফর ও আলোচনার ফলাফল ইতিবাচক হলেও এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। সামনে আরও আলোচনা, সমঝোতা এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জব্দ সম্পদ ছাড় এবং তেল বিক্রিতে সীমিত ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়েই সংঘাতের পথ থেকে ধীরে ধীরে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোতে চাইছে। তবে এখনো অনেক জটিল বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে।
তবু ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের সিদ্ধান্ত ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়াবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার পথও কিছুটা সহজ করে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, চলমান আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোয় এবং এই অর্থনৈতিক ছাড় ভবিষ্যতের বৃহত্তর সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে কি না।

