ব্রিটেনের রাজনীতিতে এখন একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে—দেশটি কেন দীর্ঘ সময় একজন প্রধানমন্ত্রী ধরে রাখতে পারছে না? একের পর এক নেতা আসছেন, বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অর্থনীতি বদলে দেওয়ার কথা বলছেন; কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাইরে থেকে এটি শুধু রাজনৈতিক সংকট মনে হলেও ভেতরের গল্প অনেক গভীর। আসল চাপ তৈরি হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, আয় কমে যাওয়া, করের বোঝা, দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক হতাশা থেকে।
যুক্তরাজ্য এখন প্রায় সাত বছরে ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীর পথে। এই ধারাবাহিক পরিবর্তন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পালাবদল নয়; এটি একটি বড় জাতীয় অস্থিরতার লক্ষণ। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর পদ ছাড়ছেন। তাঁর আগে ঋষি সুনাক, লিজ ট্রাস, বরিস জনসন ও থেরেসা মে—প্রত্যেকেই প্রায় একই ধরনের কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ দীর্ঘমেয়াদে জনসমর্থন ধরে রাখতে পারেননি।
লিজ ট্রাসের উদাহরণ সবচেয়ে নাটকীয়। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব দুই মাসেরও কম স্থায়ী হয়েছিল। কর কমানোর এমন এক পরিকল্পনা তিনি সামনে এনেছিলেন, যার অর্থায়নের পরিষ্কার উৎস ছিল না। এর ফলে ব্রিটিশ আর্থিক বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়। বন্ড বাজার কার্যত তাঁর সরকারকে জানিয়ে দেয়, এই পথে হাঁটার জায়গা নেই। অর্থাৎ ব্রিটেনের রাজনীতিতে এখন শুধু ভোটার নয়, বাজারও নেতাদের সীমা টেনে দিচ্ছে।
তবে বাজারের প্রতিক্রিয়া যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, শেষ পর্যন্ত রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারণ করে সাধারণ মানুষ। মানুষ যখন দেখে বাজারে জিনিসের দাম বাড়ছে, বাসা ভাড়া বা মর্টগেজ চাপ বাড়ছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে, অথচ বেতন সেইভাবে বাড়ছে না—তখন সরকারের ওপর আস্থা কমতে শুরু করে। ব্রিটেনেও ঠিক সেটাই ঘটছে। মানুষের অনুভূতি হলো, জীবন ধীরে ধীরে আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। দীর্ঘ ১৪ বছর কনজারভেটিভ শাসনের পর ভোটাররা নতুন কিছু দেখতে চেয়েছিল। মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, ব্রেক্সিট, সরকারি ব্যয় সংকোচন—সব মিলিয়ে ব্রিটিশ সমাজ তখন ক্লান্ত। মানুষ ভেবেছিল, নতুন সরকার হয়তো জীবনযাত্রার চাপ কমাবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে। কিন্তু প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করা বোনাস বাদে গড় সাপ্তাহিক বেতন ১ শতাংশেরও কম বেড়ে ৪৯৪ পাউন্ডে পৌঁছেছে। ২০১৯ সালের পরের প্রবৃদ্ধিও খুব শক্তিশালী নয়। অর্থাৎ কাগজে সামান্য উন্নতি থাকলেও মানুষের হাতে বাড়তি স্বস্তি পৌঁছায়নি। আয় সামান্য বাড়লেও খরচের চাপ এত বেশি যে সাধারণ মানুষ বাস্তব জীবনে উন্নতির অনুভব পাচ্ছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করের চাপ। ব্রিটেনে করের বোঝা বহু দশকের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে জনগণ বেশি কর দিচ্ছে, অন্যদিকে তারা সরকারি সেবা, অবকাঠামো, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মানে প্রত্যাশিত উন্নতি দেখছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এত কর দেওয়ার পরও জীবন কেন সহজ হচ্ছে না?
ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কম প্রবৃদ্ধি। অর্থনীতি শক্তিশালীভাবে বাড়লে সরকার বেশি বিনিয়োগ করতে পারে, কর কমানোর সুযোগ পায়, অবকাঠামো উন্নত করতে পারে এবং মানুষের জন্য সেবা বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে সরকারের হাতে সুযোগ কমে যায়। ঋণ বাড়ে, ব্যয় বাড়ে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে থেরেসা মে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বছরে গড়ে প্রায় ১ শতাংশের মতো ছিল বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন, যা জীবনযাত্রার মান বোঝার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। জনসংখ্যা বাড়লেও অর্থনৈতিক উৎপাদন সেই অনুপাতে শক্তিশালী হয়নি। ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও ব্যক্তি পর্যায়ে সমৃদ্ধির অনুভূতি তৈরি হয়নি।
এই দুর্বল প্রবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। ব্রেক্সিটের পর বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শ্রমবাজারে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। মহামারি অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি ও খাদ্যদামের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সরকারি ব্যয় সংকোচনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অবকাঠামো ও জনসেবায় দৃশ্যমান হয়েছে। এর ওপর নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এপ্রিল মাসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি মাত্র ০.৮ শতাংশ বাড়তে পারে। জানুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় এটি অর্ধ শতাংশ পয়েন্ট কম। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দামে চাপ তৈরি হওয়ায় এই পূর্বাভাস আরও দুর্বল হয়েছে। অর্থাৎ নতুন নেতৃত্ব এলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা খুব দ্রুত বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
এই জায়গাতেই ব্রিটেনের রাজনৈতিক সমস্যা আরও জটিল। প্রত্যেক নতুন নেতা ক্ষমতায় এসে অর্থনীতি ঠিক করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু অর্থনীতির গভীর কাঠামোগত সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা যায় না। নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে সময় লাগে। জ্বালানির দাম কমানো সহজ নয়। বাড়ি নির্মাণ বাড়াতে পরিকল্পনা, জমি, অনুমোদন, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় রাজনীতির জটিলতা পেরোতে হয়। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা দরকার।
কিয়ার স্টারমারের সরকারও কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছিল। বিনিয়োগ বাড়ানো, আবাসন নির্মাণ ত্বরান্বিত করা, অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়া—এসব ছিল বড় লক্ষ্য। কিন্তু রাজনৈতিক ভুল, দুর্বল বাস্তবায়ন এবং দ্রুত ফল না দেখাতে পারার কারণে সেই পরিকল্পনার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। ভোটাররা দীর্ঘমেয়াদি নীতির চেয়ে দৈনন্দিন খরচের চাপ বেশি অনুভব করে। বাজারে দাম, বেতনের অঙ্ক, বাড়ির ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল—এসবই শেষ পর্যন্ত সরকারের জনপ্রিয়তার প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে।
মে মাসের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় ক্ষতি এই অসন্তোষকেই সামনে আনে। ভোটাররা শুধু দলের প্রতি ক্ষোভ দেখায়নি; তারা জানিয়ে দিয়েছে, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে যদি দ্রুত স্বস্তি দেওয়া না যায়, তবে সমর্থন ধরে রাখা কঠিন। জীবনযাত্রার ব্যয় যে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, তা নির্বাচনের ফলাফলেও প্রতিফলিত হয়েছে।
ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী তাই এমন এক অর্থনীতি হাতে পাবেন, যেখানে আশা কম, চাপ বেশি। সরকারি ঋণ উঁচু, কর বেশি, প্রবৃদ্ধি দুর্বল, জ্বালানি ব্যয় অনিশ্চিত, আবাসন সংকট দীর্ঘমেয়াদি এবং জনগণের ধৈর্য কমে এসেছে। ফলে শুধু নতুন মুখ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, স্থিতিশীল নেতৃত্ব এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
ব্যবসায়ী মহলও স্থিতিশীলতা চাইছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তবে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা আস্থা পাবে না। আর ব্যবসার ব্যয় না কমলে জীবনযাত্রার ব্যয়ও সহজে কমবে না। কারণ উৎপাদন, পরিবহন, জ্বালানি ও শ্রমব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে।
ব্রিটেনের বর্তমান সংকট তাই শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি একটি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক দুর্বলতার ফল। নেতৃত্ব বদল এই সমস্যার দৃশ্যমান দিক; ভেতরের কারণ হলো মানুষের পকেটের চাপ। যখন নাগরিকরা মনে করে তারা বেশি কাজ করেও আগের মতো স্বস্তি পাচ্ছে না, তখন তারা দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়।
এই বাস্তবতায় ব্রিটেনের পরবর্তী নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষকে আবার বিশ্বাস করানো যে ভবিষ্যৎ বর্তমানের চেয়ে ভালো হতে পারে। কিন্তু সেই বিশ্বাস শুধু বক্তৃতায় ফিরবে না। বেতন, দাম, কর, বাড়ি, জ্বালানি ও জনসেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। না হলে প্রধানমন্ত্রী বদলাবে, দল বদলাবে, স্লোগান বদলাবে—কিন্তু ব্রিটেনের অস্থিরতার মূল কারণ একই থেকে যাবে।
শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের রাজনীতি আবার পুরোনো সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে: অর্থনীতি ভালো না হলে ক্ষমতার আসন নিরাপদ থাকে না। ভোটাররা আদর্শ, দল বা ব্যক্তিত্বের চেয়ে আগে দেখে নিজেদের জীবন। আর সেই জীবন যদি ক্রমেই কঠিন হয়, তবে কোনো প্রধানমন্ত্রীই দীর্ঘদিন নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন না।

