মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের অন্যতম জটিল সংকট নতুন এক কূটনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক আলোচনায় অগ্রগতির পর আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ নিয়ে আরও বিস্তারিত ও কারিগরি পর্যায়ের আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
দুই দেশের মধ্যে গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর ভিত্তিতেই এই নতুন আলোচনা প্রক্রিয়ার সূচনা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—সাম্প্রতিক সমঝোতাকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকর এবং টেকসই চুক্তিতে রূপ দেওয়া।
পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর মঙ্গলবার (২৩ জুন) পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই অগ্রগতির কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আলোচনায় অংশ নেওয়া পক্ষগুলো আগামী ৬০ দিনের মধ্যে বিভিন্ন জটিল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করেছে।
শাহবাজ শরিফ এই অগ্রগতিকে শুধু একটি কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, বহু বছর ধরে অবিশ্বাস ও উত্তেজনার মধ্যে থাকা দুটি দেশের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ শুরু হওয়াই বড় একটি অর্জন।
তবে আলোচনার ইতিবাচক পরিবেশের মধ্যেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আলোচনার কাঠামোর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলা হলেও তেহরান তা সরাসরি অস্বীকার করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে বলেছেন, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং এ ধরনের আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়েও তারা কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
এছাড়া সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো নিয়ে নতুন বিতর্কও সামনে এসেছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের এখনই ওইসব স্থাপনায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। ফলে পরমাণু কর্মসূচির স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনায় নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। একদিকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে চায় ইরান, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত এড়িয়ে স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। এই স্বার্থের মিলই দুই দেশকে আবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, কূটনৈতিক অগ্রগতি যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, সামনে এখনো বহু কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। পরমাণু কর্মসূচির সীমা কোথায় হবে, নিষেধাজ্ঞা কতটা শিথিল হবে, আটকে থাকা সম্পদ কীভাবে মুক্ত করা হবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে উভয় পক্ষ কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দেবে—এসব বিষয়ই আগামী ৬০ দিনের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে।
তাই বার্গেনস্টকের বৈঠককে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে দীর্ঘ ও জটিল কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি নতুন সূচনা বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এখন দেখার বিষয়, আগামী দুই মাসের আলোচনায় উভয় পক্ষ তাদের অবস্থানের ব্যবধান কতটা কমাতে পারে এবং সেই আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য চুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয় কি না।

