পশ্চিমবঙ্গে মৌসুমি দুর্যোগ আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রবল ঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত এবং ঘন ঘন বজ্রপাতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে ঝড়ের তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে কলকাতা ও আশপাশের এলাকা। উপড়ে গেছে অসংখ্য গাছ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যানবাহন এবং বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
সোমবার সকাল থেকেই কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় অস্বাভাবিক গরম এবং ভ্যাপসা আবহাওয়া অনুভূত হচ্ছিল। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এমন পরিস্থিতি সাধারণত শক্তিশালী বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস দেয়। দুপুরের দিকে হঠাৎ করেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় তীব্র ঝড় ও মুষলধারে বৃষ্টি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঘন ঘন বজ্রপাত, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির খবর এসেছে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, কোচবিহার, পুরুলিয়া এবং উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা থেকে। নিহতদের বেশিরভাগই বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় অবস্থান করছিলেন। কেউ মাঠে কৃষিকাজ করছিলেন, কেউ গবাদিপশু আনতে গিয়েছিলেন, আবার কেউ দৈনন্দিন কাজে বাইরে ছিলেন। প্রকৃতির এই আকস্মিক আঘাতে তারা প্রাণ হারান।
কোচবিহারে বজ্রাঘাতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে আহতদের চিকিৎসা চলছে। পুরুলিয়াতেও একই ধরনের ঘটনায় দুইজন নিহত হয়েছেন। সেখানে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
মুর্শিদাবাদে একটি নৌকায় বজ্রপাতের ঘটনায় একজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। নদীপথে চলাচলের সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। যদিও আবহাওয়া খারাপ হওয়ার আগেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল, তারপরও অনেক মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে যাতায়াত অব্যাহত রাখেন।
উত্তর চব্বিশ পরগনার কাঁচড়াপাড়ায় এক যুবকের মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া ফেলেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েকজন বন্ধু একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। হঠাৎ বজ্রপাত হলে একজন গুরুতর আহত হন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, কলকাতা শহরও ঝড়ের ধাক্কায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধর্মতলা, মৌলালি, ডাফরিন রোড, হাইকোর্ট এলাকা এবং শহরের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে। ফলে যান চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হয়। কিছু স্থানে গাছ ভেঙে পার্কিংয়ে রাখা গাড়ির ওপর পড়ে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। শিয়ালদহ রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকাতেও ঝড়ের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
বিদ্যুতের খুঁটি ও তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু এলাকায় সাময়িক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঘটনাও ঘটে। ঝড় থেমে যাওয়ার পরপরই পৌর কর্তৃপক্ষ, দমকল বাহিনী এবং দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মীরা মাঠে নামেন। উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ, রাস্তা পরিষ্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করা হয়।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ঝড়ের সময় বাতাসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার ছিল। তবে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে অতিভারি বৃষ্টির আশঙ্কা থাকায় প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে। বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কৃষক, জেলে এবং খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং ঝড়ো হাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে। তাই সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে খোলা মাঠে না যাওয়া, বড় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কবার্তা নিয়মিত অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এক দিনের এই দুর্যোগ আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, সচেতনতা এবং দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার গুরুত্বও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে এই ঘটনা।

