গাজায় চলমান যুদ্ধ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে কমিশন অভিযোগ করেছে, ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর চালানো হামলার অনেক ঘটনাই ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে গাজায় নিহত শিশুদের সংখ্যা অন্তত ২০ হাজার ১৭৯ জন। মোট নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু, যা তদন্তকারীদের মতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি চিত্র।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতের সংঘাতগুলোর তুলনায় এবার শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৮-০৯ এবং ২০১৪ সালের যুদ্ধের সময় নিহতদের প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল শিশু। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতে সেই হার বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। কমিশনের মতে, এই প্রবণতা শুধু যুদ্ধের তীব্রতার ফল নয়; বরং এটি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার কিংবা তাদের সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা আরও দাবি করেছেন, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও শিশু হতাহতের ঘটনা বন্ধ হয়নি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ফিলিস্তিনি শিশুদের প্রাণহানি ঘটতে থাকায় গাজায় পরিচালিত সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ের সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শুধু প্রাণহানিই নয়, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবেও গাজার শিশুরা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। খাদ্য, ওষুধ এবং মানবিক সহায়তার ঘাটতি, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং অব্যাহত নিরাপত্তাহীনতার কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক শিশু পরিবার হারিয়েছে, অনেকেই বেড়ে উঠছে ধ্বংসস্তূপ ও শরণার্থী শিবিরের পরিবেশে।
প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমেছে এবং মাতৃস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও অবনতির দিকে গেছে। একই সঙ্গে গর্ভপাতের হার বৃদ্ধির বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
গাজার বাইরে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিশন। সেখানে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, গণগ্রেপ্তার, আটক অবস্থায় নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নয় ইসরায়েল। জেনেভায় দেশটির প্রতিনিধি দল প্রতিবেদনটিকে ‘মিথ্যা ও মানহানিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, প্রতিবেদনে সংঘাতের প্রেক্ষাপট এবং হামাসের ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে এটি একটি একপাক্ষিক মূল্যায়ন।
তবুও প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজায় শিশুদের বিপুল প্রাণহানি এবং মানবিক বিপর্যয় নিয়ে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক পরিসরে আরও বড় ধরনের বিতর্ক দেখা দিতে পারে। যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য যে সবচেয়ে বেশি দিতে হয় সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের—জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন সেই কঠিন বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

