দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা এই দুই ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, স্থগিত করা হয়েছে স্কুল, মেট্রো ও রেল চলাচল। একই সঙ্গে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে মাঠে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনী।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পরেই আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প আঘাত হানে। অল্প সময়ের ব্যবধানে এত বড় দুটি কম্পন আঘাত করায় বহু এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা এখনো পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করতে পারেননি। তবে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভবন ধসে পড়া, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, রাজধানীর কাছে মাইকেতিয়ায় অবস্থিত সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রো ও রেলসেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে।
সরকার কেবল পরিবহন ও শিক্ষা খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জরুরি নয় এমন প্রায় সব ধরনের সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করছে।
দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্ব সরাসরি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ডের নেতৃত্বে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত পৌঁছাতে এবং আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেয়ো জানিয়েছেন, অনেক মানুষ বর্তমানে চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বিশেষভাবে শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং নাগরিকদের একে অপরের খোঁজখবর নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার ঝুঁকি বিশ্লেষণ। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে ১০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির সম্ভাবনা ৪৪ শতাংশ এবং ১ লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানির সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। যদিও এটি চূড়ান্ত হিসাব নয়, তবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
এছাড়া ভূমিকম্পের পর ভূমিধস এবং মাটি তরলীকরণের ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে। মাটি তরলীকরণ এমন একটি ঘটনা, যেখানে ভূমিকম্পের তীব্র কম্পনে মাটি তার শক্তি হারিয়ে প্রায় তরলের মতো আচরণ করতে শুরু করে। এর ফলে ভবন, সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামো হঠাৎ ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজ নয়, বরং পরবর্তী কয়েক দিন ও সপ্তাহে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি এখনো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা এই দুই শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

