মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির পরিবেশ পুরোপুরি স্থিতিশীল হওয়ার আগেই আবারও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরানকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ভবিষ্যতে ইরান যদি আবারও সহিংসতার পথ বেছে নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
শনিবার (২৭ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় ভ্যান্স বলেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তিকে সম্মান জানিয়েছে। তাঁর মতে, কোনো বিষয়ে মতবিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে কিংবা মধ্যস্থতাকারীদের সহযোগিতায় সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নিজের বার্তায় তিনি আরও বলেন, ইরান যদি যুদ্ধবিরতির কোনো শর্ত নিয়ে আপত্তি জানাতে চায়, তাহলে টেলিফোনে কিংবা কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তা জানাতে পারে। কিন্তু হামলার পথ বেছে নিলে যুক্তরাষ্ট্রও তার জবাব শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই দেবে। তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ওয়াশিংটন এখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিকল্পও খোলা রাখছে।
বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি। সম্প্রতি ইরান ঘোষণা দিয়েছে, এই জলপথ ব্যবহারকারী বিদেশি জাহাজগুলোকে টোল দিতে হবে এবং হরমুজ দিয়ে চলাচলের আগে ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার। ওমান উপকূল ঘেঁষে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এভার লাভলি। ইরানের দাবি, জাহাজটি প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই ওই পথ ব্যবহার করছিল। এরপর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জাহাজটির দিকে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিক্ষেপ করে।
এই ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড (সেন্টকোম) ইরানের ড্রোন ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থার ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় আইআরজিসি। এক বিবৃতিতে তারা দাবি করে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে সেন্টকোমের অভিযানের তীব্র সমালোচনা করে এটিকে ‘উসকানিমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
আইআরজিসি আরও জানায়, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনেকটাই ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে। পাশাপাশি তারা সতর্ক করে বলেছে, যদি আবারও এ ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হয়, তাহলে তার জবাব আগের চেয়ে আরও কঠোর ও ব্যাপক হবে।
মাত্র কয়েক দিন আগে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর অনেকেই আশা করেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আশাকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করছে, অন্যদিকে ইরান সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। এই অঞ্চলে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস কমেনি। তাই দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু না হলে ছোট একটি ঘটনা থেকেও বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহই নি

