ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর দেশটির মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন হাজারো মানুষ, আর এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ অথবা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শনিবার দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য এবং রাজধানী কারাকাসের আশপাশের অঞ্চল। এসব এলাকায় অসংখ্য ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধারকর্মীরা দিন-রাত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত মানুষ এবং মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরিত হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর থেকে শত শত আফটারশক অনুভূত হচ্ছে। ফলে উদ্ধারকাজ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ যেকোনো সময় আবার ভেঙে পড়তে পারে, যা উদ্ধারকর্মীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ভেনেজুয়েলার এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ছে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি বিদেশি উদ্ধারকর্মী দেশটিতে পৌঁছেছেন। আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলার পথে রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মানবিক সহায়তা ও উদ্ধার সরঞ্জাম পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারের দাবি, এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন অথবা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন। তবে বিরোধী শিবির-সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই সংখ্যা সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি এবং দুই পক্ষের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই দুটি ভূমিকম্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। সংস্থাটির প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি হতে পারে। যদি সেই আশঙ্কা সত্যি হয়, তবে এটি গত এক শতকে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পগুলোর অন্যতম হয়ে উঠবে।
এই দুর্যোগের প্রভাব শুধু মানবিক ক্ষেত্রেই নয়, ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে ১৫ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে আরও বড় অঙ্কের একটি নতুন সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার প্রস্তুতিও চলছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ভেনেজুয়েলায় ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরে অনেকেই মনে করছেন, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের এই মুহূর্তে রাজনৈতিক উদ্যোগের পরিবর্তে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ভেনেজুয়েলার এই দুর্যোগ এখন কেবল একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি একটি বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। উদ্ধার অভিযান যত দীর্ঘ হচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের জীবন রক্ষার সম্ভাবনা ততই কমে আসছে। অন্যদিকে আফটারশক অব্যাহত থাকায় উদ্ধারকর্মীরাও প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন।
আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজদের সন্ধান, আন্তর্জাতিক সহায়তার গতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে ভেনেজুয়েলা কত দ্রুত এই ভয়াবহ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পারবে।

