ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সংকটে পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে ফ্রান্সে, যেখানে চলতি মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার মানুষের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রাই এই অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রধান কারণ।
রোববার ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, চলতি মাসে মৃত্যুর সংখ্যা আগের মাসগুলোর গড় হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুন থেকে রোববার পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত নয় এবং পরবর্তী যাচাইয়ের পর এতে পরিবর্তন আসতে পারে।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট বলেন, দেশজুড়ে চলমান তীব্র দাবদাহ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভোগা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তিনি জানান, বিভিন্ন স্বাস্থ্য সূচক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার মৃত্যুর হার আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফ্রান্সের হাসপাতালগুলোতেও তাপপ্রবাহের সরাসরি প্রভাব পড়েছে। রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার ও শনিবার জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। অতিরিক্ত গরমজনিত অসুস্থতা, পানিশূন্যতা এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে অনেক মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
শুধু ফ্রান্স নয়, ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি। জার্মানির আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, সপ্তাহের শেষ দিকে দেশটিতে আরও কয়েক দফা রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে। একই সময়ে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি রাখা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী এই দাবদাহের কারণে শনিবার ইউরোপজুড়ে প্রায় ২০ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মধ্যে ছিলেন। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ডে আগের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে।
তাপপ্রবাহের প্রভাব স্বাস্থ্যখাতের বাইরেও পড়ছে। অস্ট্রিয়া জানিয়েছে, দেশটির জরুরি সেবা বিভাগে চাপ ১৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে স্পেনের প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দিনেই সম্ভবত তীব্র গরমের কারণে ২১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চরম আবহাওয়ার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনজীবনও ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রান্স, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসে অতিরিক্ত গরমের কারণে বেশ কয়েকটি স্ট্রিট পার্টি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সঙ্গীত উৎসব বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় বাইরে বের না হওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে শুধু মৃত্যুর সংখ্যাই বাড়ছে না, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবনেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
ফ্রান্সে অতিরিক্ত ১ হাজার মৃত্যুর প্রাথমিক হিসাব দেখাচ্ছে যে, দাবদাহ এখন আর শুধু মৌসুমি অস্বস্তির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি উচ্চ তাপমাত্রা আরও কয়েক দিন স্থায়ী হয়, তাহলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

