একসময় ভাবা হতো মানুষ তার বুদ্ধিবৃত্তির মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও সমাজের সার্বিক সত্য বুঝে ফেলবে ও সেই জ্ঞানের মাধ্যমে ইতিবাচক বদল ঘটানো সম্ভব। এই ভাবনার মধ্য দিয়েই উদারপন্থী মুক্তচিন্তার ধারণা আমাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু মিশেল ফুকোর চিন্তায় মানবসত্তা আসলে একটি প্রযুক্তিগত নির্মাণের ফসল।
ফরাসি চিন্তাবিদ ও ঐতিহাসিক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে। শতবর্ষে প্রধানত প্রশস্তিমূলক লেখা প্রকাশিত হয়, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘হেজিওগ্রাফি’। এই লেখায় আমরা সচেতনভাবেই কোনো স্তুতিমূলক ভণিতায় যাব না। যদি যাই সেটি অবশ্য ফুকোর স্মৃতির প্রতি অসম্মান প্রকাশ করা হবে; কারণ তাঁর তত্ত্বের মূল জায়গাই ছিল জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ক।
স্তুতিমূলক লেখনী একজন মানুষের চিন্তাকে মান্যতা দেয়, তাকে উদযাপন করে এবং সেটি হয়ে ওঠে এক ক্ষমতার ভাষ্য—যাকে প্রশ্ন করা চলে না, তার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি উন্মোচন করাও সম্ভব হয় না। ফুকো এই পদ্ধতির বিরোধী ছিলেন এবং তিনি জ্ঞান-ক্ষমতার যুগ্ম নিয়মের আড়ালে যে অবদমিত জ্ঞানের (subjugated knowledges) উপস্থিতি, তাকে খনন করার কথা বলেন। আমাদের সময় এই একুশ শতকে এসেও বারংবার ফুকোর চিন্তাকে সত্য প্রমাণ করে। অতঃপর ফুকোর চিন্তাকে অনুসরণ করে এই সময়, আর সেই চিন্তাকে প্রসারিত করে।
একসময় ভাবা হতো মানুষ তার বুদ্ধিবৃত্তির মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও সমাজের সার্বিক সত্য বুঝে ফেলবে ও সেই জ্ঞানের মাধ্যমে ইতিবাচক বদল ঘটানো সম্ভব। এই ভাবনার মধ্য দিয়েই উদারপন্থী মুক্তচিন্তার ধারণা আমাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু মিশেল ফুকোর চিন্তায় মানবসত্তা আসলে একটি প্রযুক্তিগত নির্মাণের ফসল (technologies of the self)।
কথাটা শুনলে কিছুটা অবাক লাগে। কারণ, আমরা সাধারণ নিয়মে জেনে এসেছি মানুষ একটি প্রাকৃতিক প্রাণী এবং মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি তার একটি স্বাভাবিক ক্ষমতা। সেখানে যন্ত্র এলো কোথা থেকে?
ফুকোর চিন্তায় এই ‘সেলফ’ বা আত্মন আসলে পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, রাজনীতি ও সামাজিকতা ইত্যাদির মতো জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নির্মিত বস্তু। মূলস্রোতের ক্ষমতা-কাঠামো অনুসারে সেই ক্ষমতার মধ্যে থেকেই তার পক্ষে অথবা বিপক্ষে চালিত হয় আমাদের ভাবনা।
তাই মানবসত্তা যন্ত্রের মতোই একটি নির্মাণ—জ্ঞান ও ক্ষমতার নির্মাণ। এই সময় এই তত্ত্ব যেন বারংবার সত্য প্রমাণিত হয়। ঠিক সেই কারণেই আমরা আজ দেখছি উদারপন্থী বা চিন্তায় যে সব ভাবনায় (সাম্য, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবতাবাদ ইত্যাদি) আগে মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধির ফসল মনে করা হতো, বিশ্বজোড়া দক্ষিণপন্থার উত্থানে সেগুলির মান্যতা হারাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসকে বিশ্বদরবারে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার প্রাচীন বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়ে তাঁর কাজগুলো গবেষকদের কাছে আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আমরা অনেক সময় তথাকথিত শিক্ষিত সভ্য মানুষের মৌলবাদী, রক্ষণশীল, নারী-বিদ্বেষী ও সমকামী-বিদ্বেষী মানসিকতা দেখলে অবাক হই, শিহরিত হই। কিন্তু যদি মেনে নিই মানবসত্তা একটি নির্মাণ-প্রকল্প এবং চারপাশের ভাবনা, কথাবার্তা ও অভ্যাসের মাধ্যমে যে অন্তর্বয়ান বা ফুকোর ভাষায় ‘ডিসকোর্স’ তৈরি হয় তার মাধ্যমেই আমাদের চিন্তা কাজ করে, তাহলে এই বদলকে বুঝতে অসুবিধা হয় না।
মার্ক্সবাদীদের সঙ্গে এখানেই ফুকোর মূল বিরোধ। মার্ক্সের চিন্তায় যেমন মানুষের শোষণের পক্ষে-বিপক্ষে শত্রুমিত্র স্পষ্ট বোঝা যায়, ফুকোর চিন্তায় তেমন কিছু নেই। জার্মান দার্শনিক নিটশের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার তত্ত্বের হাত ধরে ফুকো দেখিয়েছেন যে এই দুনিয়ায় সবই ক্ষমতার খেলা। বাঙালি গায়ক নচিকেতার গানের লাইন তুলে বলা যায়— “বিজয়ীরা বরাবর ভগবান এখানেতে, পরাজিতরাই পাপী এখানে।”
এই পথ ধরেই বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সারা বিশ্বজুড়ে চলেছে প্রান্তিক ভাবনার রাজনীতি। তাদের মূল ভাষ্য ছিল কীভাবে নারী, সমকামী, কালো মানুষ, উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশের মানুষ কিংবা ভারতের ক্ষেত্রে দলিত মানুষের চিন্তা এবং প্র্যাকটিসকে বরাবর মূলস্রোতের ইউরোকেন্দ্রিক বিশ্বের জ্ঞানচর্চার বাইরে রাখা হয়েছে। সেই সব পরাজিত মানুষের জ্ঞানসমূহ ফিরিয়ে নিয়ে আসাই ছিল বিশ শতকের শেষ তিন দশকের রাজনীতি। কিন্তু ফুকোর দেখানো পথে এই রাজনীতি আসলে রাজনীতির মূল ভাবনাকে একভাবে পরাস্ত করে। কারণ প্রতিটি মানুষ একভাবে তাঁর বৌদ্ধিক ও অভিজ্ঞতাগত নির্মাণের ফসল। সে যেন কিছুতেই মুক্তচিন্তা করতে পারে না। মিশেল ফুকোর অনুগামী আমরা।
মিশেল ফুকোর চিন্তাকে অনুসরণ করে বিশ্বজুড়ে আজ রক্ষণশীল চিন্তার প্রত্যাবর্তন ঘটছে। একুশ শতক থেকে ধীরে ধীরে প্রগতিশীল চিন্তাকেই যেন একভাবে জ্ঞান ও ক্ষমতার যৌথ ঔদ্ধত্য মনে করা হচ্ছে। নতুন দক্ষিণপন্থার উত্থান এর হাত ধরেই। পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বাম শাসন এবং পনেরো বছর তৃণমূল সরকারের শাসনের পর, ভারতের কেন্দ্রে শাসনকারী দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির ক্ষমতায় আসার পরবর্তীতে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু কর্মকাণ্ড তার হাতে গরম প্রমাণ।
কে এন পানিক্করের মতো সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদ সংস্কৃতিপীঠ কলকাতা খুব বেশি পায়নি। ঐতিহাসিক কে এন পানিক্কর বোধহয় আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাস চর্চায় সেই বিরল ঐতিহাসিক যিনি ইতিহাস চর্চায় ‘সংস্কৃতি’কে প্রধান গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চায় প্রথমদিকে ‘রাজনীতি’ ও পরবর্তীকালে ‘অর্থনীতি’ এবং ‘সমাজনীতি’কে গুরুত্ব দেওয়া হতো।
এই দলের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অতিরিক্ত বামমনস্কতা বিকল্প ইতিহাসচিন্তার গতিরোধ করেছে। সেই দক্ষিণপন্থী ইতিহাসচর্চাকে ফিরিয়ে আনতেই ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’-এর মতো অনুষ্ঠানকে সরকারি সমর্থনে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পালন করা হচ্ছে। এই দিবস বাংলার ভাঙন এবং পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে হিন্দু বাঙালির বাসস্থান হিসেবে ভারতের অংশ করে তোলার সিদ্ধান্তগ্রহণকে উদযাপন করে।
একইভাবে উদযাপিত হয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের হিন্দুত্ববাদী নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন। এ তো একভাবে ফুকোর দেখানো পথ। তাঁদের যুক্তি অত্যন্ত স্পষ্ট—ভারতীয় হিন্দুর দৃষ্টিকোণ, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানসমূহকে গুরুত্ব দেয়নি বামপন্থী ইতিহাসচিন্তা।
অনুরূপভাবে, কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’ বা ভারতীয় জ্ঞানচর্চার প্রসারের জন্য পাঠক্রমে ভারতীয় (মূলত হিন্দু) দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, সমাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি ইত্যাদির পাঠ একরকমের ডিকলোনিয়াল প্রকল্প—যা ইউরোকেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চার প্রাধান্যকে প্রশ্ন করতে চায়। এইসব অভিযোগ যে মিথ্যা, সে কথা বলা চলে না। আর এই লেখায় ফুকোর দেখানো পথ ধরে এই সব চর্চার সত্য-মিথ্যার আলোচনায় আমরা যাচ্ছিও না।
শুধু বলব, এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায় এই ধরনের ক্ষমতার আলোচনা কীভাবে আমাদের একভাবে অ-রাজনৈতিক করে তুলেছে; যেখানে যেকোনো নৈতিক কিংবা সামাজিক চিন্তাকে বক্তার রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিচয়ের নিরিখে বিচার করা হয়, যেন সত্য বলে কিছু হয় না।
পরিহাসের ব্যাপার এটাই যে, ফুকো জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্কের কথা বললেও কোথাও কিন্তু কোনো চিন্তা-কাঠামোকে সর্বৈব সত্য ধরে নিতে বলেননি। এই বিচার আসলে প্রবহমান। এই কথা প্রান্তিক মানুষের রাজনীতি (নারী, দলিত, কালো মানুষ, সংখ্যালঘু) অনেক সময় ভুলে গিয়েছে। আর দক্ষিণপন্থীদের কথা বলাই বাহুল্য। তারা নিজেদের ধর্মের ও রাষ্ট্রের মানুষ বিপন্ন এবং তাদের অভিজ্ঞতা ও চর্চায় থাকা সত্য অবহেলিত বলে বলে আসলে নিজেদের নির্মিত ইতিহাসকেই ছড়িয়ে দিতে চায়।
আধুনিক যুগে আমরা প্রায়ই তথ্যকে (Information) জ্ঞান (Knowledge) বলে ভুল করি। গুগল আমাদের অগণিত তথ্য দেয়, কিন্তু প্রজ্ঞা দেয় না। সক্রেটিসের শিক্ষা ছিল— তথ্যের স্তূপ নয়, বরং তার বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা জরুরি।
মিশেল ফুকো সম্পর্কে একটি সাধারণ ভুল ধারণা ভাঙানো দরকার। অনেকেই তাঁকে কেবল জ্ঞান, ক্ষমতা এবং ভাষার তাত্ত্বিক মনে করেন। এই তিনটি ধারণাই একপ্রকার বায়বীয়। কিন্তু ফুকো গভীরভাবে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস ও আচরণের তাত্ত্বিক ছিলেন। এই অভ্যাসের মধ্য দিয়েই মানুষের মনন গড়ে ওঠে এবং জন্ম নেয় অনুশাসন।
আজকের পশ্চিমবঙ্গে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উদযাপনের নির্দেশ এবং কর্মচারীদের সেখানে অংশ নেওয়ার নিদান হোক, বা কলকাতার সরকারি স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনকে দিয়ে প্রকারান্তরে খাদ্যতালিকায় নিরামিষ চালু করার নিয়মই হোক—আসলে সেসব মানুষের অভ্যাসে এক চিরস্থায়ী বদল আনার প্রয়াস। প্রশ্ন অবশ্যই এখানে যোগাভ্যাসের উপকারিতা (বাঙালির যোগাভ্যাস দীর্ঘদিনের) বা নিরামিষ আহারে উপযুক্ত পুষ্টি লাভ হয় কি না সেটা নয়। প্রশ্ন এখানে অভ্যাসে পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও মতাদর্শে দীর্ঘমেয়াদি বদল ঘটানো।
পশ্চিমবঙ্গে এই দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক বদলকে ফুকোর ভাষায় আমরা ‘জেনিওলজিক্যাল ভাঙন’ বলতে পারি। ফুকো ইতিহাসকে হেগেলের মতো করে ধারাবাহিকতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার রূপ হিসেবে দেখেননি (যার খোলনলচে বদলে পরে মার্ক্স গ্রহণ করেন)। তিনি ইতিহাসকে দেখেছেন আকস্মিক ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে। নিটশের ভাবনায় গ্রিক দেবতা ডায়োনাইসাসের সৃষ্টি এবং ধ্বংসের উন্মাদ-নৃত্যের মতোই (আমাদের দেশে শিবের তাণ্ডবনৃত্যের অনুরূপ) এই নাচ।
তাই উদারপন্থী চিন্তা সকলে সমানভাবে গ্রহণ করবে এবং মানুষ ধীরে ধীরে আরও বেশি করে ভাবনার মুক্তির দিকে যাবে—এই আশা করা নেহাতই আদর্শবাদ— বাস্তবের সঙ্গে এর মিল নেই। এই নৈর্ব্যক্তিক ও নিরাসক্ত ইতিহাসের বর্ণনা মাঝেমাঝে মুক্তচিন্তার মানুষদের ফুকোর প্রতি ক্রুদ্ধ করে তোলে। যার জবাব দিতে ফুকো লিখেছিলেন “Useless to Revolt?” (1979)-এর মতো প্রবন্ধ। তাঁর কাছে বিদ্রোহের পথ হলো একটি সভ্যতা বা সমাজে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাগুলি জানা। এই জানাই বোধহয় অচলাবস্থা অতিক্রমের পথ দেখাতে পারে এবং তৈরি করতে পারে নতুন বিদ্রোহের সম্ভাবনা।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে উদারপন্থী মুক্তচিন্তার কাঠামোয় সব থেকে বড় আঘাতটি এসেছিল ২০০১ সালের ৯/১১ তারিখে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে ইসলামিক জঙ্গি হানার মধ্য দিয়ে। এই আঘাত ছিল পশ্চিমা লিবারেল বহুসাংস্কৃতিক ও আপাতদৃষ্টিতে সহনশীল সমাজ এবং সভ্যতার উপর এক বড় আক্রমণ।
আজ কেন বিশ্বজুড়ে প্রচুর মানুষ দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে, কেন শিক্ষিত যুবক-যুবতী আইসিসের মতো মানবতাবিরোধী জঙ্গি দলে নাম লেখাচ্ছে, কেনই বা আমেরিকার ট্রাম্প সরকার তীব্রভাবে অভিবাসী-বিরোধী হয়েও সে দেশের মানুষের সমর্থন পাচ্ছে, বা ভারতের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ কেনই বা লিবারেল এবং ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার বিরোধী হয়ে উঠছে—সেটি একটি গভীর রাজনৈতিক প্রশ্ন।
ফরাসি চিন্তাবিদ মিশেল ফুকোর ভাবনা অনুসরণ করে আমরা এর একটি কারণ ভেবে দেখতে পারি। যে আত্মনির্মাণের প্রযুক্তির কথা তিনি রূপক অর্থে বলেছিলেন, সেটি আজ বাস্তবেও যান্ত্রিক রূপ নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে দ্রুতগামী প্রযুক্তির ব্যবহারে এখন চলছে জ্ঞান ও অর্থনির্মাণের মগজ-ধোলাইয়ের খেলা। সেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে রেডিমেড মৌলবাদী, পরধর্ম বা পরজাতিবিদ্বেষী ভাবনা; ঠিক যেভাবে প্রত্যেকের কাছে কর্পোরেট কোম্পানি পৌঁছে দেয় পছন্দের খাবার, পরিধেয় অথবা বেড়ানোর জায়গার খবর।
আজ ফুকো কথিত শাসনতান্ত্রিকতা—যা শুধু শাসকের একক পরিকল্পনা নয়, আমরাও যাকে নিজেদের অজান্তে আপন করে নিয়ে থাকি—সেটি যন্ত্রের মাধ্যমে নির্মিত ও প্রচারিত হচ্ছে কম্পিউটারের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। এভাবেই একুশ শতকে ফুকোর চিন্তার সম্প্রসারণ ঘটছে।
আমাদের যাঁরা শাসন করেন, তাঁরা মনে হয় আমাদের চেয়ে ভালো করে ফুকো পড়েছেন। আমরা তাঁকে পড়ে দেখব কি না, সে তো ভবিষ্যৎ বলবে; আমরা শুধুই আশা করতে পারি। ফুকো তাঁর ‘যৌনতার ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে লিখেছিলেন, আগামীকাল সবকিছু আরও সুখের হবে—এই ধারণার ফাঁদে ফেলে মানুষকে আরও বেশি করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আমরা সেই ধারণাকে অনুসরণ করে আজ সোচ্চারে বলতেই পারি— “আচ্ছে দিন আনে ওয়ালা হ্যায়।” ফুকো আমাদের শিখিয়েছেন, প্রতিটি সমাজব্যবস্থায় কিছু কথা প্রকাশ্যে বলা সম্ভব হয়ে ওঠে না, তাই আপাতত নীরবতা।

