ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও দুর্যোগের ভয়াবহতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নতুন নতুন মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। কোথাও আবার দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর জীবিত মানুষকে বের করে আনতে সক্ষম হচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ততই কমে আসছে।
সোমবার (২৯ জুন) রাতে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভয়াবহ এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৭১৯ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে লা গুয়াইরা বন্দর এলাকায়। ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়া স্বজনদের খুঁজে বের করতে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই শাবল, কোদাল ও হাতুড়ি হাতে উদ্ধার অভিযানে নেমেছেন। ভারী যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং সময়ের চাপের মধ্যেও তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা ছাড়তে রাজি নন।
এরই মধ্যে সোমবার ভোরে আবারও একটি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। যদিও এতে নতুন করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবুও মানুষের আতঙ্ক আরও বেড়েছে। একের পর এক আফটারশকের কারণে অনেক পরিবার এখনও ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছে না। তারা খোলা জায়গা কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন।
তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও আশার একটি খবর এসেছে। সোমবার ভোরে ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকার পর ২১ বছর বয়সী এক যুবককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন উদ্ধারকর্মীরা। এমন উদ্ধার ঘটনাগুলো বিপর্যস্ত মানুষের মনে নতুন আশা জাগালেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময় যত গড়াচ্ছে, ততই জীবিত কাউকে উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই ভূমিকম্পকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এখন সরকারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য যত বেশি সম্ভব মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার উত্তরাঞ্চলের লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই দুই ভূমিকম্পে প্রায় ৮০০টি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধসে পড়ে। এরপর থেকে একের পর এক পরাঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সর্বশেষ সোমবার কারাকাস ও লা গুয়াইরায় ৪ দশমিক ৬ মাত্রার একটি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে।
দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করলেও উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও অনেক স্থানে উদ্ধারকাজে তাদের সক্রিয় ভূমিকা খুব একটা চোখে পড়েনি। কারাকাসের পশ্চিমে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকা এল জুনকুইতোর বাসিন্দারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সরকারি সহায়তা সীমিত হওয়ায় স্থানীয় কৃষক এবং সাধারণ মানুষের দেওয়া খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীই এখন অনেক দুর্গত মানুষের প্রধান ভরসা।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, বর্তমানে ২৫ হাজারেরও বেশি জরুরি কর্মী, পুলিশ সদস্য ও সেনাসদস্য উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে কাজ করছেন। তার ভাষায়, এই সংকটময় সময়ে প্রতিটি জীবন বাঁচানোই সবচেয়ে বড় অর্জন।
বিশ্লেষকদের মতে, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পরও ভেনেজুয়েলার সামনে কঠিন পথ অপেক্ষা করছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, বহু হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জই এখন দেশটির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

