বিশ্বজুড়ে ধূমপানের অভ্যাসে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। প্রচলিত সিগারেটের পরিবর্তে অনেক ব্যবহারকারী এখন ভ্যাপ, নিকোটিন পাউচসহ ধোঁয়াবিহীন বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
এই পরিবর্তিত বাজার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বড় ধরনের পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে বিশ্বের অন্যতম তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি)। ব্যয় কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম গড়ে তোলার অংশ হিসেবে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার কর্মীর চাকরি বিলুপ্ত বা আউটসোর্সিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানির ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৫ হাজার ৫০০টি পদ সরাসরি বাতিল করা হবে। একই সময়ে আরও প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি পদের দায়িত্ব বাইরের প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। বর্তমানে বিএটির বিশ্বব্যাপী কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজার। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মোট কর্মীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পুনর্গঠনের প্রভাবের মধ্যে পড়বেন।
ব্যয় কমানোর লক্ষ্য হিসেবে কোম্পানিটি প্রায় ৬০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান। এই অর্থ সাশ্রয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ব্যবসাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কর্মী পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকায় তাদের একটি উৎপাদন কারখানাও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ তামাকপণ্যের বিস্তার এবং বাজারে অসম প্রতিযোগিতার কারণে ওই কারখানা চালিয়ে যাওয়া আর অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক থাকছে না।
বিএটির পুনর্গঠনের প্রভাব শুধু একটি বা দুটি দেশে সীমাবদ্ধ থাকছে না। যুক্তরাজ্য, কোস্টারিকা, মেক্সিকো, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে কর্মরত অনেক কর্মী এই পরিবর্তনের আওতায় আসবেন। এসব দেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কাজ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
বিশ্ব তামাকশিল্পে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপানবিরোধী প্রচারণার কারণে বহু দেশে সিগারেটের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। যুক্তরাজ্যের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পর দেশটিতে ধূমপায়ীর সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাজ্যেই নয়, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আরও অনেক দেশেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিএটির ব্যবসায়। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কমে ২৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন পাউন্ডে নেমে এসেছে। যদিও রাজস্বে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে, তবু ধোঁয়াবিহীন বিকল্প পণ্যের বাজারে প্রতিষ্ঠানটি নতুন গ্রাহক পেয়েছে। গত বছর প্রায় ৪৭ লাখ নতুন ব্যবহারকারী ভ্যাপ ও নিকোটিন পাউচজাতীয় পণ্য ব্যবহার শুরু করেছেন।
বাজারের এই পরিবর্তনকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি নতুন কৌশল নিয়েছে কোম্পানিটি। ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি ধোঁয়াবিহীন পণ্য থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে প্রচলিত সিগারেটের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে বিকল্প নিকোটিন পণ্যের ব্যবসা সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হবে।
তবে এই নতুন বাজারেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভ্যাপ ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করায় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোও চাপে পড়েছে। ফলে বাজার ধরে রাখতে নতুন পণ্য উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিএটি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী তাদেউ মারোকো বলেছেন, ব্যয় কমানোর এই কর্মসূচি ভবিষ্যতের ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী করবে। তার মতে, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কার্যক্রম আরও দক্ষ করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কোম্পানির অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা জাভেদ ইকবালও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং ডেটা বিশ্লেষণের ব্যবহার বাড়ার ফলে ভবিষ্যতে অনেক প্রচলিত চাকরির প্রয়োজন কমে যেতে পারে। সাম্প্রতিক কর্মী পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত সেই পূর্বাভাসেরই বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাজারও এ ঘোষণাকে সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা প্রকাশের পর লন্ডন শেয়ারবাজারে বিএটির শেয়ারের দর প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন ছিল না। তবে এত বড় পরিসরে কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত বাজারের একটি অংশকে বিস্মিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তামাক শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সিগারেটের চাহিদা কমছে, অন্যদিকে বিকল্প নিকোটিন পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে বড় কোম্পানিগুলোকে শুধু নতুন পণ্য বাজারে আনলেই হবে না, একই সঙ্গে ব্যয় কমানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্গঠন করেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। বিএটির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সেই বৈশ্বিক পরিবর্তনেরই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

