মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার প্রথমবারের মতো কাতারের কাছ থেকে উপহার পাওয়া নতুন উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেছেন। ৪০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বোয়িং ৭৪৭-৮০০ মডেলের এই উড়োজাহাজটি সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি আকাশযান হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে মেরামত, পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই, প্রযুক্তিগত হালনাগাদ এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির পর এটি ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, নতুন এই উড়োজাহাজে ট্রাম্পের প্রথম যাত্রা হয়েছে নর্থ ডাকোটার উদ্দেশে। সেখানে তিনি থিওডর রুজভেল্ট রাষ্ট্রপতি গ্রন্থাগারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে এই গ্রন্থাগার উদ্বোধন করা হয়।

সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত এয়ার ফোর্স ওয়ানের বাহ্যিক সাজে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে আকাশের রঙের সঙ্গে মিল রেখে এর মূল রঙ হালকা নীল রাখা হতো। তবে ট্রাম্প সেই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তার পছন্দ অনুযায়ী নতুন উড়োজাহাজটি গাঢ় নীল, লাল ও সোনালি রঙে সাজানো হয়েছে।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের ব্যবহৃত উড়োজাহাজ শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, ক্ষমতা ও প্রতীকের অংশ। তাই তিনি মনে করেন, এমন উড়োজাহাজের সাজসজ্জা সাধারণ নয়, বরং জাঁকজমকপূর্ণ হওয়া উচিত।
উড়োজাহাজটির ভেতরেও বিলাসিতার ছাপ রাখা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এতে দামি কার্পেট, শোয়ানো যায় এমন আসন, কাঠের প্যানেল এবং সিট বেল্টে প্রেসিডেন্টের বিশেষ সিলের নকশা যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি সরকারি উড়োজাহাজ নয়, বরং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রুচি ও রাজনৈতিক উপস্থাপনার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে উঠেছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প জানান, তিনি এই বিলাসবহুল উড়োজাহাজ নিয়ে গর্বিত। তার ভাষায়, একটি উড়োজাহাজকে চাইলে খুব সাদামাটা রাখা যায়, আবার জাঁকজমকপূর্ণভাবেও তুলে ধরা যায়। তিনি স্পষ্ট করেন যে, তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছেন।
তবে এই উড়োজাহাজকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প তার পূর্বসূরি জো বাইডেনের ব্যবহৃত প্রায় ৩৬ বছরের পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ান বদলের উদ্যোগ নেন। তার চাহিদা অনুযায়ী নতুন উড়োজাহাজ তৈরির জন্য বোয়িং ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় চায়। এই দীর্ঘ সময়ের ফাঁক পূরণ করতে ট্রাম্প কাতারের কাছ থেকে পাওয়া উড়োজাহাজটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন।
হোয়াইট হাউসে ফেরার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্প উড়োজাহাজটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এরপর দ্রুত এটিকে তার ব্যবহারের উপযোগী করার নির্দেশ দেন। অল্প সময়ে কাজ শেষ করার চাপ থাকায় এয়ার ফোর্স ওয়ানের কিছু প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই উড়োজাহাজে পুরোপুরি যুক্ত করা যায়নি বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।

এপি তার বিশ্লেষণে জানিয়েছে, শীতল যুদ্ধ আমলের পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে যে ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ ও পাল্টা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ছিল, তার সবকিছু এই নতুন উড়োজাহাজে নেই। এ কারণে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, এত দ্রুত প্রস্তুত করা উড়োজাহাজটি প্রেসিডেন্টের দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক সফরের জন্য কতটা উপযোগী, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
অন্যদিকে মার্কিন বিমানবাহিনী বলছে, উড়োজাহাজটি দ্রুত প্রস্তুত করা হলেও নিরাপত্তা, সুরক্ষা বা সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থায় কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। বিমানবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, কেবিনের বিন্যাস প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা উন্নয়নে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের কম ব্যয় হয়েছে।
তবু সংশয় কাটছে না। উড়োজাহাজ ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ জেরেমায়াহ গার্টলারের মতে, এই উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা পুরোপুরি নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যোগাযোগব্যবস্থাও তুলনামূলক দুর্বল। তাই তিনি মনে করেন, এটি মূলত দেশের ভেতরে ভ্রমণের জন্য বেশি উপযোগী, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সফরের জন্য নয়।
এই বিতর্কের মাঝেই ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহার করবেন। এই ঘোষণার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। কারণ, একটি নতুন ও বিতর্কিত উড়োজাহাজকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্যবহার করা শুধু যাতায়াতের সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা বুধবার উড়োজাহাজটির ভেতরের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করেন। সাধারণত প্রেসিডেন্ট নিজে উপস্থিত না থাকলে এয়ার ফোর্স ওয়ানের ভেতরের ছবি তোলার অনুমতি সাংবাদিকরা পান না। তাই প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রকাশ করা ছবিগুলো নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ছবিগুলো শেয়ার করেন হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং এবং মার্কিন প্রটোকল প্রধান মনিকা ক্রাউলি।
নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান নিয়ে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে কাতারের দেওয়া উপহারকে ঘিরে। সমালোচকেরা বলছেন, একটি বিদেশি দেশের কাছ থেকে এত মূল্যবান উড়োজাহাজ গ্রহণ করা নৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত যেকোনো সম্পদ শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং জনআস্থার প্রশ্ন জড়িত।
তবে ট্রাম্প এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, এটি এমন একটি দেশের কাছ থেকে পাওয়া উপহার, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদয় আচরণ করেছে। তিনি বিষয়টিকে কোনো অনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখছেন না। বরং তার দাবি, মেয়াদ শেষে তিনি উড়োজাহাজটিকে রাষ্ট্রপতি গ্রন্থাগারের অংশ করে নেবেন।

রাজনৈতিকভাবে এই উড়োজাহাজ ট্রাম্পের পরিচিত কৌশলের সঙ্গেই মিলে যায়। তিনি প্রায়ই শক্তি, ঐশ্বর্য ও দৃশ্যমান প্রভাবকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করেন। তার কাছে এয়ার ফোর্স ওয়ান শুধু নিরাপদ ভ্রমণের বাহন নয়; এটি নেতৃত্বের প্রতীক, রাষ্ট্রীয় মর্যাদার মঞ্চ এবং নিজের শাসনধারার প্রদর্শনী।
তবে এই প্রদর্শনীর বিপরীতে নিরাপত্তা, ব্যয়, নৈতিকতা এবং বিদেশি উপহারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। একদিকে ট্রাম্প এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদার নতুন প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে সমালোচকেরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্টের সরকারি আকাশযান নিয়ে এমন তাড়াহুড়া ও বিলাসী উপস্থাপন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কাতারের দেওয়া এই উড়োজাহাজ এখন শুধু নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান নয়; এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক ভাষা, রাষ্ট্রীয় প্রতীক ব্যবহারের ধরন এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আরেকটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। নর্থ ডাকোটায় প্রথম সফরের মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও সামনে তুরস্কের ন্যাটো সম্মেলনে এর ব্যবহার ঘিরে আলোচনা আরও বাড়তে পারে।

