আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। যদিও এই বৃদ্ধি খুব বেশি নয়, তবুও এটি বাজারে নতুন করে আশাবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি প্রক্রিয়া ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে—এমন প্রত্যাশা বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে কিছুটা আস্থা তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও তারা মাথায় রাখছেন।
শুক্রবার (৩ জুলাই) ভোরের আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিশ্বের দুটি প্রধান তেল সূচকই সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হয়। বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৭ সেন্ট বা দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ৭২ দশমিক ১০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪ সেন্ট বা দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৮ দশমিক ৮৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমার সম্ভাবনা। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন এক ধরনের ‘সতর্ক আশাবাদ’ কাজ করছে। অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করতে চাইছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি প্রচেষ্টা ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে স্বাভাবিক হয়েছে—এমন বাস্তব চিত্র নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাজার এখনো সতর্ক অবস্থানেই রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগের কার্যদিবসে ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই কমে এমন পর্যায়ে নেমে এসেছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরুর আগের সময়ের পর সবচেয়ে নিম্ন অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে শুক্রবারের এই মূল্যবৃদ্ধিকে অনেকেই বাজারের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে দেখছেন।
চলতি সপ্তাহের সামগ্রিক চিত্রও তুলনামূলক স্থিতিশীল। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সপ্তাহজুড়ে মোট দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম দশমিক ১২ শতাংশ বেড়েছে। গত কয়েক মাসের মধ্যে এটিই সবচেয়ে সীমিত সাপ্তাহিক ওঠানামার একটি উদাহরণ বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকেরা।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির পর এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে আবারও স্বাভাবিক চলাচল শুরু হওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে। ওপেকভুক্ত কুয়েতের দৈনিক তেল উৎপাদন মে মাসের ৫ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল থেকে জুন মাসে বেড়ে ১৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। উৎপাদনের এই বড় উল্লম্ফন বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর সম্ভাবনাকেই ইঙ্গিত করছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো এশিয়ার বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে তাৎক্ষণিক বাজারমূল্যভিত্তিক বিক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেছে। এরই মধ্যে প্রায় এক কোটি ব্যারেল সৌদি অপরিশোধিত তেল বহনকারী অন্তত পাঁচটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করেছে বলে জাহাজ চলাচল–সংক্রান্ত তথ্য ও বাণিজ্যিক সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগামী কয়েক সপ্তাহে স্থিতিশীল থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে অঞ্চলটিতে নতুন করে কোনো সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তেলের দাম আবারও দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপদ ব্যবহার কতটা অব্যাহত থাকে তার ওপর।

