বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা দেওয়া স্থগিত করে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্তে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত ওই নীতিকে আইনবহির্ভূত ঘোষণা করে তা বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের মতে, শুধু কোনো ব্যক্তির জাতীয়তার ভিত্তিতে তার অভিবাসী ভিসা আটকে দেওয়ার যে নীতি মার্কিন প্রশাসন গ্রহণ করেছিল, তা বিদ্যমান অভিবাসন আইনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
শুক্রবার নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের বিচারক জ্যানেট ভার্গাস এই রায় দেন। তিনি মনে করেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যে নীতি জারি করেছিলেন, সেটি তার আইনগত ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রায়ে নীতিটিকে স্পষ্টতই বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, ফেডারেল অভিবাসন আইনের কাঠামোর সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় নীতিটির ধরন বিবেচনা করলে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই সিদ্ধান্তের ফলে নির্দিষ্ট ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কার্যত স্থগিত হয়ে যায়। অর্থাৎ একজন আবেদনকারীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা অন্যান্য বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করার পরিবর্তে তার দেশের জাতীয়তাই ভিসা প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বিচারক ভার্গাসের মতে, এই ধরনের সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা মার্কিন অভিবাসন আইনের বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর শামিল। আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, অভিবাসী ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কর্তৃত্ব আইন দ্বারা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে একটি দেশের বা একাধিক দেশের সব আবেদনকারীর ওপর একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা চাপানো আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই নীতির আওতায় বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও উরুগুয়ে এবং বলকান অঞ্চলের বসনিয়া ও আলবেনিয়ার নাগরিকরাও পড়েছিলেন। এ ছাড়া আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বহু দেশের নাগরিকদের ওপরও একই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তিও দেখানো হয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য ছিল, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর অনেক আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। স্থানীয়, অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার ঝুঁকিও তাদের ক্ষেত্রে বেশি বলে প্রশাসন দাবি করেছিল।
অর্থাৎ প্রশাসনের যুক্তির কেন্দ্রে ছিল সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বোঝা। কিন্তু আদালতের প্রশ্ন ছিল, এই আশঙ্কার ভিত্তিতে কি একটি দেশের সব নাগরিককে একইভাবে বিবেচনা করা যায়? বিচারকের রায় কার্যত সেই প্রশ্নেরই নেতিবাচক উত্তর দিয়েছে। আদালতের মতে, জাতীয়তার ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে অভিবাসী ভিসা আটকে দেওয়ার মাধ্যমে বিদ্যমান আইনগত কাঠামোকে অকার্যকর করা যায় না।
এই মামলা আদালতে নিয়ে যায় অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন। তাদের মধ্যে ক্যাথলিক লিগ্যাল ইমিগ্রেশন নেটওয়ার্ক ও আফ্রিকান কমিউনিটিজ টুগেদার ছিল। পাশাপাশি ভিসার আবেদনকারী এবং নির্ধারিত দেশগুলো থেকে পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার আবেদন করা মার্কিন নাগরিকরাও মামলায় যুক্ত হন।
ফলে রায়টি শুধু কয়েকটি সংগঠনের আইনি বিজয় নয়; যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মূল্যায়নের গুরুত্ব নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমা নিয়েও আদালত স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে ধারাবাহিকভাবে কঠোরতা দেখা যাচ্ছে। প্রশাসন এসব পদক্ষেপের পক্ষে জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরেছে। তবে অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এসব পদক্ষেপের বৈধতা এবং মানবিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত করা হয়েছিল। এর আগে ১ জানুয়ারি ৩৯ দেশের ওপর সার্বিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর হয়। একই সময়ে ডিসেম্বরের শেষ দিকে বৈচিত্র্যভিত্তিক অভিবাসী ভিসা ইস্যু করাও স্থগিত করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক আদালতের রায় তাই ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির ওপর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সরকার যদি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা সরকারি সম্পদের ওপর সম্ভাব্য বোঝার যুক্তিতে অভিবাসন নীতি কঠোর করতে চায়, সেক্ষেত্রেও তাকে বিদ্যমান আইনের সীমার মধ্যেই থাকতে হবে—রায়টির মূল তাৎপর্য এখানেই।
বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যও এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ ৭৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারভিত্তিক অভিবাসনসহ সংশ্লিষ্ট অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়ায় আগ্রহী বাংলাদেশি আবেদনকারীরা এই নীতির কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিলেন। আদালতের রায় সেই নীতির আইনগত ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তবে আদালতের রায় ঘোষণার পরই সব আবেদনকারীর ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাতে চলে আসবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যেতে পারে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য বাস্তব পরিবর্তন কত দ্রুত কার্যকর হবে, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এদিকে রায়ের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশাসন আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে, নাকি উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করবে—এখন সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা স্থগিতের নীতি বাতিলের এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে একটি বড় আইনি ধাক্কা। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত হতে পারে এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে অভিবাসন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সীমা কোথায়—সেই বিতর্ককেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

