ভয়াবহ ভূমিকম্পে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে একটি বহুতল ভবন। চারদিকে ধুলা, ইট-পাথর আর মৃত্যুর স্তূপ। সেই ধ্বংসস্তূপের নিচেই আটকা পড়েন দায়ানা পাতিনো এবং তার মাত্র ১৮ দিন বয়সী ছেলে হুয়ান ডেভিড। বাঁচার আশা যখন প্রায় শেষ, তখনই শুরু হয় এক মায়ের অসাধারণ সাহস, মমতা আর জীবন রক্ষার লড়াই।
ভবন ধসে পড়ার সময় গুরুতর আহত হন দায়ানা। তার একটি হাঁটু ভেঙে যায়, শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগে। প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যেও নিজের কষ্ট ভুলে তিনি বুকের সঙ্গে শক্ত করে আগলে রাখেন নবজাতক সন্তানকে। চারপাশে ছিল শুধু অন্ধকার আর ধ্বংসস্তূপ, তবুও তিনি বারবার সন্তানকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন এবং বিশ্বাস হারাননি যে, একসময় উদ্ধারকারীরা তাদের খুঁজে বের করবে।
এদিকে বাইরে শুরু হয় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্ধার অভিযান। ধসে পড়ার সময় দায়ানার স্বামী গেরসন ত্রুহিয়ো বাড়িতে ছিলেন না। দুর্ঘটনার খবর পেয়েই তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্ত্রী ও সন্তানকে জীবিত উদ্ধারের আশায় তিনি উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজেও অংশ নেন।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুসন্ধানের পর উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবনের ক্ষীণ এক সংকেত পান। তারা বুঝতে পারেন, শিশুটি এখনও বেঁচে আছে। এরপর ধ্বংসস্তূপের একটি সরু ফাঁক দিয়ে পাইপ প্রবেশ করিয়ে তার ভেতর স্ট্র লাগিয়ে শিশুটির কাছে পানি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই ছোট্ট উদ্যোগই শিশুটিকে জীবিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অবশেষে টানা ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর উদ্ধারকারীরা দায়ানা ও তার শিশুপুত্রকে জীবিত বের করে আনতে সক্ষম হন। ধ্বংসস্তূপ থেকে তাদের বের করে আনার মুহূর্তে উপস্থিত উদ্ধারকর্মী, স্বজন এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দের আবেগ ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর মা ও সন্তানকে জীবিত ফিরে পাওয়া যেন অলৌকিক এক মুহূর্তে পরিণত হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দায়ানা নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, “আমার ছেলেই আমাকে হাল ছাড়তে দেয়নি। আমি নিজেকে বারবার বলেছি, যতক্ষণ সে বেঁচে আছে, ততক্ষণ আমাকেও লড়াই করে যেতে হবে।”
উদ্ধারকর্মীদের মতে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এত দীর্ঘ সময় একটি নবজাতককে জীবিত উদ্ধার করা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা, সীমিত পরিসরে পানি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে বড় কথা, একজন মায়ের অবিচল মানসিক শক্তিই এই অলৌকিক পরিণতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দায়ানা ও তার শিশুপুত্রের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, দুর্যোগের ভয়াবহতার মাঝেও আশা, সাহস এবং মাতৃত্বের শক্তি অনেক সময় অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলতে পারে।

