মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো নেতৃত্বের অধ্যায় শেষ হলেও সংকটের সমাপ্তি এখনো দূরের বিষয়। বরং ক্ষমতার পালাবদল, যুদ্ধের অভিঘাত, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন হিসাব—সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
গত মাসে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে নৈশভোজের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সম্ভবত চেয়েছিলেন, ট্রাম্প মত বদলানোর আগেই চুক্তির কাজ শেষ হোক। ভার্সাইয়ের ঐতিহাসিক আয়নাঘর হয়তো ট্রাম্পের মনোযোগও কাড়তে পারে—এমন হিসাবও থাকতে পারে।
কিন্তু স্থান নির্বাচনের কারণে ইতিহাসের সঙ্গে অনিবার্য তুলনা উঠে আসে। ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তি ইউরোপের মানচিত্র ও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছিল। সেই চুক্তির কঠোর ক্ষতিপূরণ দাবি জার্মানিকে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত করে তোলে, যার প্রভাব মাত্র ২০ বছরের মধ্যে আরেকটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে। ইরানের সঙ্গে বর্তমান সমঝোতা স্মারক অবশ্য চরিত্রে আলাদা, আকারেও মাত্র দেড় পৃষ্ঠার। তবু প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না—এই চুক্তিও কি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে বড় মোড় হিসেবে দেখা হবে?
প্রায় তিন সপ্তাহ পর যুদ্ধবিরতি এখনো ভঙ্গুরভাবে টিকে আছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির আশপাশে কয়েক দফা সংঘর্ষ, অনিরসনীয় পারমাণবিক প্রশ্ন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রমাণ করছে—যুদ্ধ থামলেও মূল সমস্যা থামেনি। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো আগের মতোই অস্থির, বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও অনিশ্চিত।
এই অস্থিরতার মাঝেই ইরানের ভেতরে বড় পরিবর্তন ঘটছে। দেশটি বিদায় জানাচ্ছে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে, যিনি চার মাসের বেশি আগে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন। সেই হামলায় শুধু খামেনিই নন, তেহরানের শাসনব্যবস্থার বড় অংশও কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। তার সপ্তাহব্যাপী জানাজা ও শোকযাত্রা তাই শুধু একজন নেতার বিদায় নয়; এটি পুরোনো প্রজন্ম থেকে নতুন প্রজন্মে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক।
তবে এই পালাবদল ইরানকে দুর্বল করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ নয়। বরং প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যাদের সরিয়ে দিয়েছে, তাদের স্থানে কি আরও কঠোর, আরও হিসাবি এবং আরও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নেতৃত্ব উঠে এসেছে?
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার হিসাব নতুনভাবে সাজিয়ে দিয়েছে। বড় যুদ্ধ প্রায়ই আঞ্চলিক রাজনীতির দাবার বোর্ড বদলে দেয়। ইরানের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। কয়েক মাস আগেও ধারণা ছিল, ইসলামি প্রজাতন্ত্র হয়তো ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার পথে। জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে জনবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তখন মনে করেছিলেন, এই বিক্ষোভ হয়তো শাসনব্যবস্থার পতনের সূচনা হতে পারে।
ইরানের অর্থনীতি তখন বহু বছরের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত। এর ওপর ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ দেশটিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, যদিও ট্রাম্প তেমন দাবি করেছিলেন; তবে তা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতের অবস্থানও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, আরও সমৃদ্ধ করা হলে সেই মজুত ১০ বা ১১টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারত। এর বড় অংশ ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনার কাছে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে বলে মনে করা হয়।
ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বলয়ের অবস্থাও তখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সিরিয়ায় ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল আসাদের সরকার ২০২৪ সালের শেষ দিকে কয়েক সপ্তাহের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহে ক্ষমতাচ্যুত হয়। লেবাননে ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে ইসরায়েল এবং বিস্ফোরক পেজার ও ওয়াকিটকির ঘটনায় সংগঠনটির যোদ্ধা কাঠামো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাজায় হামাসও একই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় দীর্ঘ ও ভয়াবহ অভিযান চালায়, যাতে বহু এলাকা ধ্বংস হয় এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পাল্টা হামলা চালায়, যার কিছু হামলায় হুতি নেতৃত্বও লক্ষ্যবস্তু হয়। সব মিলিয়ে ইরানের মিত্র নেটওয়ার্ক একের পর এক আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করেছিলেন, ইরান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল। এমনকি খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প কয়েকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছিলেন যেখানে বলা হয়েছিল, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান এত দুর্বল আর কখনো ছিল না। তাই ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকবে—এমন ধারণা তখন অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে গেছে। এর বড় কারণ, ইরান দেখিয়েছে যে প্রয়োজনে সে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি—হরমুজ প্রণালি—অবরুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। হরমুজ প্রণালি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। ইরান সেই ঝুঁকিকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ট্রাম্প দাবি করতে পছন্দ করেন যে তিনি ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, যদি তা সত্যও হয়, তবে সেই পরিবর্তন তেহরানের জন্য উল্টো সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ নতুন নেতৃত্ব পুরোনো নেতৃত্বের মতো শুধু আদর্শিক ভাষণে আটকে নেই; তারা রাষ্ট্র রক্ষা, ক্ষমতা ধরে রাখা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগী।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বয়স ৫৬। তিনি তার বাবা আলি খামেনির চেয়ে ৩০ বছর ছোট। আলি খামেনি নিহত হওয়ার আগে শারীরিকভাবে দুর্বল বলে মনে করা হতো। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বয়স ৭১ হলেও ১৯৭৯ সালের বিপ্লবী প্রজন্ম কার্যত দৃশ্যপট থেকে সরে গেছে। সংসদের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান আহমদ ভাহিদি—দুজনই ষাটের কোঠায়। এই নেতৃত্বের বড় অংশের সঙ্গে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এই পরিবর্তনের গুরুত্ব এখানেই। আগে ইরানের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আলি খামেনির সতর্ক নীতির ওপর নির্ভর করত। তিনি এমন এক কৌশল অনুসরণ করতেন, যাকে অনেকেই বলতেন—না যুদ্ধ, না শান্তি। অর্থাৎ তিনি সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সংঘর্ষ এড়িয়ে চাপ ধরে রাখতেন, আবার সম্পূর্ণ সমঝোতার দিকেও এগোতেন না। নতুন নেতৃত্ব সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে তুলনামূলক আক্রমণাত্মক কৌশল নিয়েছে।
২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে বিপ্লবী গার্ডের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হলে ইরান প্রতিশোধের আগে সংকেত দিয়েছিল। এরপর ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, তবে কোনো মার্কিন সেনা নিহত হননি। তখন তেহরান যেন হিসাব করে সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।
কিন্তু এ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পূর্ণাঙ্গ হামলার মুখে ইরান আর সেই ধরনের সংযম দেখায়নি। বাহরাইনে পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিসহ অঞ্চলের একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। কুয়েতে ৬ জন মার্কিন সেনা নিহত হয় এবং লড়াইয়ের সময় শত শত মানুষ আহত হয়। এই প্রতিক্রিয়া ওয়াশিংটনকে নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করায়।
ইরানের আরেকটি বার্তা ছিল আরও বিস্তৃত—উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি থাকলে সেগুলো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নাও দিতে পারে; বরং সেই দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি ও উপসাগরীয় মিত্রতার মাধ্যমে ইরানকে ঘিরে রাখার কৌশল নিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, সেই কৌশল আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে।
এ কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নতুন করে ভাবছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের পথও খুঁজছে। সৌদি আরব ২০২৩ সালে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল। এখন খবর এসেছে, সৌদি আরব ইরান ও উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের নিয়ে একটি পুনর্মিলন বৈঠকের কথাও ভাবছে। তবে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করবে—এমন সম্ভাবনা এখনো কম। তারা বিকল্প খুঁজতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তাদের নির্ভরতা এখনো ওয়াশিংটনের ওপরই বেশি।
এই অবস্থাকে অনেকে সম্ভাবনায় ভরা নমনীয় মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। পুরোনো শত্রুরা নতুন সম্পর্কের হিসাব করছে। কিন্তু বাস্তববাদ বাড়লেও আস্থার ঘাটতি এখনো গভীর। ইরান, উপসাগরীয় দেশ, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র—সব পক্ষই বহু বছরের সন্দেহ, সংঘাত ও প্রতিশোধের ইতিহাস বহন করছে।
ইরানের ভেতরের প্রশ্ন আরও জটিল। জানুয়ারিতে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে বলেছিলেন, সাহায্য আসছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার সময় তিনি আরও সরাসরি আহ্বান জানান—যুদ্ধ শেষে তারা যেন নিজেদের সরকার নিজেরা গ্রহণ করে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তব হয়নি। তেহরানে নতুন প্রজন্ম ক্ষমতায় এলেও তারা জনগণকে স্বাধীন, সমৃদ্ধ বা অংশগ্রহণমূলক ভবিষ্যতের স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেয়নি।
নতুন নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য এখন রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা। তাই ভিন্নমত দমনে বড় পরিবর্তন আসবে—এমন আশা করার কারণ কম। রাস্তায় বিক্ষোভ, তরুণদের ক্ষোভ, জানুয়ারির রক্তাক্ত দমনপীড়নের স্মৃতি—সবই শাসকদের মাথায় আছে। ফলে নিরাপত্তা নজরদারি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা বেশি।
তবু সামাজিক ক্ষেত্রে কিছু নীরব পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধের আগেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে হিজাব প্রয়োগ অনেক জায়গায় শিথিল ছিল। তেহরানের কিছু রেস্তোরাঁয় মদ নীরবে পাওয়া যেত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো বড় স্বাধীনতার নিদর্শন নয়, কিন্তু শাসনব্যবস্থার বাস্তববাদী অভিযোজনের লক্ষণ হতে পারে। নতুন নেতৃত্ব হয়তো বুঝছে, শুধু দমন দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
ইরানি জনগণের অনুভূতিও এখন দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে তারা শাসনব্যবস্থার কঠোরতা, জানুয়ারির দমনপীড়ন এবং রাজনৈতিক অধিকারহীনতায় ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা যখন ইরানের শহর, স্থাপনা ও বেসামরিক জীবনে আঘাত হানে, তখন ক্ষোভের দিকও বদলে যায়। যুদ্ধের প্রথম দিনে মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বহু শিশুর মৃত্যু অনেক ইরানিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—যারা মুক্তির কথা বলছে, তারা কি সত্যিই মুক্তি দিতে এসেছে, নাকি দেশটিকেই ধ্বংস করছে?
এই মানসিক পরিবর্তন নতুন শাসকদের জন্য সুযোগও তৈরি করেছে। তারা দেখাতে চাইছে, তারা অন্তত দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা—এই বর্ণনা ব্যবহার করে তারা নিজেদের বৈধতা কিছুটা পুনর্গঠন করার চেষ্টা করতে পারে। তবে সেটি স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে অর্থনীতি, সামাজিক ছাড়, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং কূটনৈতিক ফলাফলের ওপর।
ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রলোভন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সম্ভাবনা। সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ইরান ইতিমধ্যে ৬০ দিনের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছাড় পেয়েছে, যার ফলে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ৬০ দিনের আলোচনাকালে আরও ছাড় আসতে পারে। এর মধ্যে ইরানের জব্দ থাকা বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড়ের বিষয়ও থাকতে পারে। চূড়ান্ত চুক্তি হলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
সমঝোতা স্মারকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ২২৫ বিলিয়ন পাউন্ডের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ আছে। তবে এই অর্থ কে দেবে, কীভাবে ব্যবহৃত হবে এবং কোন শর্তে বাস্তবায়ন হবে—তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবু অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি ইরানের নতুন নেতৃত্বের জন্য বড় প্রণোদনা। বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের ক্ষতি এবং সামাজিক অসন্তোষের পর অর্থনীতি সামলাতে পারলে তারা অভ্যন্তরীণ সুনাম কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে পারে।
কিন্তু এই সুযোগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। আলোচনা ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আবার যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে। ট্রাম্প ধৈর্য হারালে বা ইরান পারমাণবিক ছাড় দিতে রাজি না হলে তৃতীয় দফা সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। লেবানন যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, পারমাণবিক কর্মসূচি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং উভয় পক্ষের কট্টরপন্থীদের অবস্থান—সব মিলিয়ে ব্যর্থতার কারণের অভাব নেই।
ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা তাই একই সঙ্গে শক্তিশালী ও দুর্বল। শক্তিশালী, কারণ তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ওপর ভর করে রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে বাস্তব চাপের মুখে ফেলতে পারে। দুর্বল, কারণ জনগণের সঙ্গে তাদের আস্থার সম্পর্ক ভেঙে গেছে, অর্থনীতি ক্লান্ত, তরুণ প্রজন্ম বিচ্ছিন্ন, আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্দেহ প্রবল।
এই মুহূর্তে ইরান পুরোনো নিশ্চিততা ও নতুন সম্ভাবনার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে। একদিকে বিপ্লব-উত্তর প্রজন্ম ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রকে আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, সামরিকভাবে দৃঢ় এবং কৌশলগতভাবে আক্রমণাত্মক পথে নিতে পারে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের সামাজিক ছাড়, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং নতুন ধরনের রাষ্ট্রীয় চুক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের জন্যও এটি বড় পরীক্ষা। যদি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো এই সুযোগকে স্থায়ী কাঠামোয় রূপ দিতে পারে, তবে বহু বছরের সংঘাতের পর নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। কিন্তু সামান্য ভুল হিসাব, হরমুজে নতুন সংঘর্ষ, পারমাণবিক আলোচনায় অচলাবস্থা বা কট্টরপন্থীদের চাপ আবার পুরো অঞ্চলকে আগুনের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—নতুন ইরান কি পুরোনো শত্রুতাকে নতুন বাস্তবতায় বদলাতে পারবে, নাকি নতুন নেতৃত্ব কেবল পুরোনো সংঘাতকে আরও কঠিন রূপ দেবে? উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এতটুকু নিশ্চিত, আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরান আর আগের ইরান নেই। আর এই বদলে যাওয়া ইরানকে বুঝতে না পারলে মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী সংকটও বোঝা কঠিন হবে।

