মাত্র তিন বছর আগেও শ্রীলঙ্কা ছিল গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে থাকা একটি দেশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ, জ্বালানি ও ওষুধ আমদানির অর্থ নেই, রাস্তায় মানুষের ক্ষোভ, আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন—সব মিলিয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটি স্বাধীনতার পর সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক সময়ের মুখোমুখি হয়েছিল। সেই শ্রীলঙ্কাই এখন আবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা ফিরে পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট ডেটা গ্রুপ চলতি সপ্তাহে শ্রীলঙ্কাকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত করেছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ। এটি বিশ্বব্যাংকের আগের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। ওই বছরের জন্য বিশ্বব্যাংক শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করেছিল।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেতে মাথাপিছু জিএনআইয়ের ন্যূনতম সীমা ৪ হাজার ৪৯৬ ডলার। শ্রীলঙ্কা খুব বেশি ব্যবধানে না হলেও সেই সীমা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেশটি আবার সেই জায়গায় ফিরেছে, যেখান থেকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সময় তা পিছিয়ে পড়েছিল।
এই অর্জনের গুরুত্ব শুধু একটি আয়শ্রেণি পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ মাত্র তিন বছর আগে শ্রীলঙ্কা সার্বভৌম ঋণখেলাপিতে পড়েছিল। বিশ্বব্যাংক তখনই এই সংকটকে স্বাধীনতার পর শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছিল। সেই অবস্থান থেকে এত দ্রুত উচ্চ-মধ্যম আয়ের মর্যাদায় ফিরে আসা দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, নীতি ধারাবাহিকতা এবং কঠিন সংস্কার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
শ্রীলঙ্কার এই প্রত্যাবর্তন দেখায়, শুধু সংকট থেকে বের হওয়ার ঘোষণা দিলেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায় না। এর জন্য দরকার কঠিন সিদ্ধান্ত, ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক ইচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলো স্বীকার করার সাহস।
২০২২ সালের এপ্রিল মাসে শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে খেলাপি হয়। সে সময় দেশটি প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক দায় পরিশোধ স্থগিত করে। স্বাধীনতার পর এটাই ছিল শ্রীলঙ্কার প্রথম সার্বভৌম ঋণখেলাপি হওয়ার ঘটনা। এর পেছনে কোনো একক কারণ ছিল না; বরং একাধিক নীতিগত ভুল, বহিঃআঘাত এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা একসঙ্গে মিলে সংকটকে বিস্ফোরিত করে।
সরকারের বড় ধরনের কর ছাড় রাজস্ব আয়ে বড় ধাক্কা দেয়। রাষ্ট্রের আয় কমে যায়, কিন্তু ব্যয় কমেনি। বহুদিন ধরে চলা বড় বাজেট ঘাটতি এবং চলতি হিসাব ঘাটতি মেটাতে শ্রীলঙ্কা ক্রমেই বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ঋণ নিয়ে উন্নয়ন ও ব্যয় চালানোর এই ধারা একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে নতুন ঋণ না পেলে পুরোনো দায় পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে হামলার অভিঘাত। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির জন্য পর্যটন ছিল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় উৎস। সেই হামলার পর পর্যটন খাত বড় ধাক্কা খায়। এরপর কোভিড-১৯ মহামারি পর্যটন শিল্পকে আরও বিপর্যস্ত করে। বিদেশি পর্যটক কমে যায়, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থান কমে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
একই সময়ে বৈশ্বিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কার আমদানি ব্যয় বাড়ে। জ্বালানি, খাদ্য, সার ও অন্যান্য জরুরি পণ্য কিনতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দরকার হচ্ছিল। কিন্তু রিজার্ভ কমছিল দ্রুত। ফলে ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ তীব্র হয়। একপর্যায়ে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এতটাই কমে যায় যে জ্বালানি, গ্যাস, ওষুধের মতো মৌলিক পণ্য আমদানির অর্থ পরিশোধ করাও সম্ভব হচ্ছিল না।
এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সংকট ছিল না; এটি দ্রুত সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়। দীর্ঘ লাইন, জ্বালানির ঘাটতি, বিদ্যুৎ সংকট, ওষুধের অভাব এবং মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। অর্থনীতি যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি আঘাত করে, তখন নীতিগত ভুলের মূল্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই ভয়াবহ অবস্থার পর শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ৩ বিলিয়ন ডলারের সম্প্রসারিত তহবিল সুবিধা গ্রহণ করে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কঠোর আর্থিক সংযম, কর সংস্কার, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি। সহজ ভাষায়, শ্রীলঙ্কাকে আয় বাড়াতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে, ভর্তুকির চাপ কমাতে এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল।
সরকার কর সংস্কার বাস্তবায়ন করে। এর ফলে রাজস্বের ভিত্তি বিস্তৃত হয়। আগে যেসব খাত থেকে পর্যাপ্ত কর আসছিল না, সেগুলোকে কর কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা হয়। একই সঙ্গে লোকসানি ভর্তুকি কমাতে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা যৌক্তিক করা হয়। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এগুলো জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং সাধারণ মানুষের ওপর স্বল্পমেয়াদে চাপ তৈরি করেছিল। কিন্তু অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য এগুলো প্রয়োজনীয় ছিল।
সংকটে থাকা অর্থনীতির জন্য এগুলো অনেকটাই প্রচলিত ব্যবস্থাপত্র। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিশেষত্ব হলো, দেশটি মাঝপথে নীতি বদলায়নি। কয়েকটি কঠিন বাজেট চক্রজুড়ে সরকার একই ধরনের সংস্কার চালিয়ে গেছে। অর্থাৎ, শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই এখানে মূল পার্থক্য তৈরি করেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান শ্রীলঙ্কার ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শ্রীলঙ্কা একগুচ্ছ আর্থিক ও মুদ্রানীতিগত পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার সমন্বিতভাবে এসব নীতি বাস্তবায়নে কাজ করেছে। এ কারণেই তারা অর্থনীতিকে আবার দাঁড় করাতে পেরেছে।
শুধু অভ্যন্তরীণ সংস্কার নয়, ঋণ পুনর্গঠনও শ্রীলঙ্কাকে বড় স্বস্তি দিয়েছে। সংস্কার কর্মসূচি যতই শক্তিশালী হোক, ঋণের চাপ কমানো ছাড়া দেশটির পক্ষে দ্রুত স্থিতিশীলতায় ফেরা কঠিন ছিল। বেসরকারি বন্ডহোল্ডার ও চীনের সঙ্গে ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি এবং ভারতের ৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা শ্রীলঙ্কাকে দায় পরিশোধের সময় ও সুযোগ দিয়েছে। এর ফলে স্থিতিশীলতা কর্মসূচি ভেঙে না দিয়ে দেশটি ঋণ ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যেতে পেরেছে।
এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ যখন ঋণসংকটে পড়ে, তখন শুধু খরচ কমানো বা কর বাড়ানো যথেষ্ট হয় না। পুরোনো ঋণ কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে, দায় পরিশোধের সময়সূচি কীভাবে সহজ করা হবে এবং নতুন অর্থায়নের পথ কীভাবে খোলা থাকবে—এসবও সমান জরুরি। শ্রীলঙ্কা বাহ্যিক সহায়তা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার সমন্বয় ঘটাতে পেরেছে। এই সমন্বয়ই পুনরুদ্ধারকে টেকসই পথে এগিয়ে দিয়েছে।
তবে স্থিতিশীলতা নিজে নিজে প্রবৃদ্ধি এনে দেয় না। স্থিতিশীলতা শুধু প্রবৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে সেই প্রবৃদ্ধির বড় চালক হয়েছে পর্যটন ও রেমিট্যান্স। ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কায় পর্যটক আগমন ২০ লাখ ছাড়ায়। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। পর্যটক বাড়ার অর্থ হলো সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি। সংকটের সময় যে রিজার্ভ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটি পুনর্গঠনে পর্যটন বড় ভূমিকা রাখে।
অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সও একই সময়ে বাড়ে। রেমিট্যান্স একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রা উৎস। পর্যটন যেখানে নিরাপত্তা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ভ্রমণ প্রবণতার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে রেমিট্যান্স নিয়মিত প্রবাহ তৈরি করতে পারে। এই দুই খাত একসঙ্গে শ্রীলঙ্কার বহিঃখাতের চাপ কমিয়েছে। ২০২২ সালে যে বৈদেশিক মুদ্রা সংকট অর্থনীতিকে ধসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সেই চাপ কমাতে পর্যটন ও রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালের ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পেছনে শুধু পর্যটন ও রেমিট্যান্স নয়, বিস্তৃত শিল্প পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিকেও কারণ হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার একক খাতনির্ভর ছিল না। পর্যটন বৈদেশিক মুদ্রা এনেছে, রেমিট্যান্স স্থিতি দিয়েছে, শিল্প উৎপাদন ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং আর্থিক সেবা খাত অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সমর্থন করেছে।
শ্রীলঙ্কার গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত বিষয় হলো নীতির ধারাবাহিকতা। দেশটি প্রথম ২০১৯ সালে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু পরে সংস্কার শিথিল হয়ে পড়ে, রাজস্ব দুর্বল হয়, ঋণনির্ভরতা বাড়ে এবং সংকট গভীর হয়। ফলে শ্রীলঙ্কা সেই অবস্থান হারায়। এবার ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি তাই শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়; এটি নীতি ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ারও ইঙ্গিত।
২০২৪ সালের শেষ দিকে ক্ষমতায় আসে ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার প্রশাসন। নতুন সরকার চাইলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-সমর্থিত কর্মসূচি নতুন করে আলোচনা বা শিথিল করার চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু তারা মূল কাঠামো চালিয়ে যায়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কর্মসূচি ধরে রাখা শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে।
অনেক দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকার বদলালেই অর্থনৈতিক কর্মসূচি বদলে যায়। পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া কঠিন সংস্কার নতুন সরকার জনপ্রিয়তার কারণে বাতিল করে দেয়। এতে বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা কমে। শ্রীলঙ্কা অন্তত এই পর্যায়ে সেই পথ নেয়নি। বরং সংকটের বাস্তবতা মেনে সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
ড. মুস্তাফিজুর রহমানের ভাষায়, শ্রীলঙ্কার প্রকৃত শক্তি হলো তারা যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা বাস্তবায়নও করে। তাঁর মতে, এটিই সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের বিষয়। রাজাপাকসে যুগের পর সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল বড় কাজ, এবং শ্রীলঙ্কা তা উল্লেখযোগ্যভাবে ভালোভাবে করতে পেরেছে। এ কারণেই দেশটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধার—দুটিই অর্জন করেছে।
এখানে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও শিক্ষা আছে। অর্থনৈতিক সংকট হঠাৎ তৈরি হয় না। বছরের পর বছর রাজস্ব দুর্বলতা, ব্যয় অনিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণের চাপ, আমদানি নির্ভরতা, রিজার্ভের ঝুঁকি এবং নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা একসময় বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। আবার সংকট থেকে বের হতেও শুধু বাহ্যিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আস্থা পুনর্গঠন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
তবে শ্রীলঙ্কার পথ এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। দেশটির পরবর্তী বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি থেকে। তখন বোঝা যাবে, বর্তমান পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কারণ সহায়তা, ঋণ পুনর্গঠন ও রেমিট্যান্স সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য দরকার বাণিজ্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধি।
অর্থাৎ, শ্রীলঙ্কাকে এখন আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে হবে রপ্তানি, উৎপাদন, সেবা, পর্যটন এবং প্রতিযোগিতামূলক শিল্পের মাধ্যমে। শুধু সহায়তা বা প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অবস্থান ধরে রাখা কঠিন। দেশটিকে এমন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা আনে, কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করে।
শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধার তাই একদিকে আশাব্যঞ্জক, অন্যদিকে সতর্কবার্তাও বটে। আশাব্যঞ্জক, কারণ ভয়াবহ সংকট থেকেও সঠিক নীতি, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সতর্কবার্তা, কারণ একবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উঠলেই সেই মর্যাদা স্থায়ী হয়ে যায় না। নীতি ভুল, ঋণচাপ, রাজস্ব দুর্বলতা এবং বহিঃখাতের সংকট আবারও অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিতে পারে।
আজকের শ্রীলঙ্কা তাই শুধু পুনরুদ্ধারের গল্প নয়; এটি শৃঙ্খলা, বাস্তববাদ এবং ধারাবাহিকতার গল্প। তিন বছর আগে যে দেশ ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েছিল, সেই দেশ এখন আবার উচ্চ-মধ্যম আয়ের মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। কিন্তু সামনে আসল পরীক্ষা এখনো বাকি। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি থেকে ঋণ পরিশোধের নতুন ধাপ শুরু হলে বোঝা যাবে, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি সত্যিই শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে, নাকি এখনো বাহ্যিক সহায়তার ওপর বেশি নির্ভরশীল।
তবু আপাতত শ্রীলঙ্কার এই ফিরে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—সংকট যত গভীরই হোক, নীতি যদি বাস্তবতার ওপর দাঁড়ায়, সরকার যদি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকে, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

