ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার নামাজ লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সড়ক শোকার্ত মানুষের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জানাজায় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, সামরিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, দেশের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের একজন আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি খামেনি এবং তার পরিবারের চার সদস্যের জানাজার নামাজে ইমামতি করেন।
রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি
জানাজার নামাজে অংশ নেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই। এছাড়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি এবং বাহিনীটির প্রধান আহমাদ ওয়াহিদিসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
তিন ছেলে উপস্থিত, মোজতবা ছিলেন না
খামেনির জানাজায় তার তিন ছেলে—মাসুদ, মেইসাম ও মোস্তফা উপস্থিত ছিলেন। তবে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে তার আরেক ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচিত মোজতবা খামেনি অনুষ্ঠানে অংশ নেননি।
ইরানি সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার কারণে তাকে জনসমক্ষে না আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের চার সদস্যেরও জানাজা
খামেনির পাশাপাশি তার পরিবারের আরও চার সদস্যের জানাজার নামাজও অনুষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানি।
অনুষ্ঠানে জাহরার ছোট কফিনটি তার দাদার কফিনের পাশেই রাখা হয়, যা উপস্থিত অনেকের আবেগকে আরও গভীর করে তোলে। একই হামলায় নিহত হন জাহরার মা এবং খামেনির কন্যা বুশরা খামেনিও।
স্লোগানে মুখর গ্র্যান্ড মোসাল্লা
জানাজা ও শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দেন। প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্থানে ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’, ‘ইসরায়েল ধ্বংস হোক’ এবং খামেনি হত্যার প্রতিশোধের দাবিতে নানা স্লোগান শোনা যায়।
অনেকের হাতে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত লাল পতাকাও দেখা যায়। শোকের পাশাপাশি রাজনৈতিক আবেগও পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
পটভূমি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনই খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাও প্রাণ হারান। ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, সে সময় সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছিল।
এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতে সামরিক ও সরকারি স্থাপনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেট্রোয় যাত্রীর রেকর্ড বৃদ্ধি
শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতির প্রভাব পড়ে রাজধানীর গণপরিবহনেও। তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রোববার সকাল ৭টা পর্যন্ত তেহরান মেট্রো নেটওয়ার্কে ৭০ লাখের বেশি যাত্রা নিবন্ধিত হয়েছে।
তবে এই সংখ্যার মধ্যে একই ব্যক্তি একাধিকবার যাতায়াত করে থাকতে পারেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া মানুষের যাতায়াত সহজ করতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে মেট্রো ব্যবহার করার আহ্বান জানানো হয়। স্থানীয় সময় রাত ৮টা পর্যন্ত গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শেষ শ্রদ্ধা ও শোকানুষ্ঠান চলার কথা রয়েছে।
খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যকে ঘিরে ইরানে কয়েক দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানে শোকযাত্রার পর তার মরদেহ অন্যান্য ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ শহরে নেওয়া হবে এবং নির্ধারিত কর্মসূচি শেষে তাকে জন্মস্থান মাশহাদে দাফন করা হবে।

