গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে। ইসরাইলের গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই গাজায় নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে তেল আবিব। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও ইসরাইলের এই পরিকল্পনা যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইসরাইলি সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১২–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের আগেই গাজায় নতুন করে সংঘাত শুরু হতে পারে। অর্থাৎ, আগামী দুই মাসের মধ্যেই সামরিক পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরাইল আশা করছে মার্কিন নেতৃত্বে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে হামাসকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ঘোষণা করবে। ইসরাইলের অভিযোগ, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক এই বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসকে চুক্তিভঙ্গকারী হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে গাজার যেসব এলাকা এখনও ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে নেই, সেখানে নতুন করে বৃহৎ সামরিক অভিযান চালানোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হবে।
চ্যানেল ১২ আরও জানিয়েছে, বোর্ডটির মহাপরিচালক নিকোলে ম্লাদেনভ প্রায় দুই মাস আগেই হামাসকে চুক্তি ভঙ্গকারী ঘোষণা করার বিষয়টি বিবেচনা করেছিলেন। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর অনুরোধে সেই সিদ্ধান্ত তখন স্থগিত রাখা হয়। রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, আগামী তিন মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে হামাসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
উল্লেখ্য, গাজা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গত জানুয়ারিতে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করা হয়। এর আগে প্রায় দুই বছর ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
দীর্ঘ সেই সংঘাতে প্রায় ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হন। ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ফিলিস্তিনি সূত্রের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরাইল এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। একই সঙ্গে তথাকথিত নিরাপদ অঞ্চল বা বাফার জোনের পরিধি বাড়ানো এবং গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে হামাস স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে যে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের সব শর্ত ইসরাইল পূরণ না করা পর্যন্ত তারা অস্ত্র সমর্পণসহ নতুন কোনো নিরাপত্তাবিষয়ক আলোচনায় অংশ নেবে না।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুদ্ধবিরতি কাগজে-কলমে বহাল থাকলেও বাস্তবে উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস এখনো কাটেনি। একদিকে ইসরাইল হামাসকে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করতে চাইছে, অন্যদিকে হামাস দাবি করছে, ইসরাইল নিজেই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টা সফল না হলে গাজা আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় গাজার ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে কূটনৈতিক উদ্যোগ, যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী কয়েক মাসে অঞ্চলটি আবারও ভয়াবহ সহিংসতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

