ন্যাটো সম্মেলনকে ঘিরে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। জোটবিরোধী বিক্ষোভ থেকে শতাধিক মানুষকে আটক করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার, বিরোধী দল এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের নিরাপত্তার অজুহাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
তুরস্কের কমিউনিস্ট পার্টি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গতকাল রাজধানীর কেন্দ্রস্থল কিজিলে স্কয়ারে ন্যাটোবিরোধী বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখান থেকেই দলের শীর্ষ নেতাসহ শতাধিক কর্মী-সমর্থককে আটক করা হয়। তবে আটকের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
আগামী মঙ্গলবার ও বুধবার আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ন্যাটোর উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন। এতে জোটভুক্ত ৩২টি সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের পাশাপাশি অংশ নেবেন ন্যাটোর বিভিন্ন সহযোগী দেশের প্রতিনিধিরাও। এত বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনকে সামনে রেখে রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসন সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনাগুলোর চারপাশে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা পতাকা হাতে ন্যাটোবিরোধী নানা স্লোগান দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেকে “খুনি ন্যাটো, দেশ ছাড়ো” এবং “ন্যাটোর কোনো ঠাঁই নেই”—এমন স্লোগানও দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং পরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
রাজধানীর বাইরে ইস্তাম্বুলেও একই দিনে ন্যাটোবিরোধী কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে তাকসিম স্কয়ার থেকে দোলমাবাহচে পর্যন্ত একটি মিছিল বের করা হয়। এছাড়া কাদিকয় জেলায় বামপন্থী বিভিন্ন সংগঠন পৃথক দুটি সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কামাল ওকুয়ান দাবি করেন, ন্যাটোর বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ একত্রিত হয়েছেন। তার ভাষায়, তারা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে আঙ্কারাকে ন্যাটো সমর্থকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে না, আর সেই অবস্থান থেকেই তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন।
এদিকে এই গণআটক নিয়ে তুরস্কের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কুর্দিপন্থী ডেম পার্টির সহসভাপতি তুনজের বাকিরহান এবং প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির আদালত-নিযুক্ত চেয়ারম্যান কামাল কিলিচদারোগলু ঘটনাটিকে মৌলিক নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার পদক্ষেপ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, ন্যাটো সম্মেলনের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তুনজের বাকিরহান অভিযোগ করেন, ন্যাটো সম্মেলনকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পুরো দেশকে কার্যত একটি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে। তার দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা অঘোষিত সামরিক শাসনের পরিবেশ তৈরি করেছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের কোনো জবাব এখনো দেওয়া হয়নি। এর আগে তুর্কি প্রসিকিউটররা জানিয়েছিলেন, সাম্প্রতিক অভিযানগুলো মূলত উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য তৎপরতা প্রতিরোধের অংশ এবং এর সঙ্গে ন্যাটো সম্মেলনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
উল্লেখ্য, গত মাসেও আঙ্কারায় পরিচালিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ২২৫ জনকে আটক করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১০৩ জনকে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এছাড়া রোববার দেশজুড়ে পরিচালিত পৃথক অভিযানে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং শিক্ষাবিদসহ আরও ৩৯ জনকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

