গত এক সপ্তাহ ধরে তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে চরম দাবদাহের কারণে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে কোটি কোটি মানুষ এখনো চরম গরমের সতর্কতার আওতায় রয়েছেন। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পূর্ব উপকূল, দক্ষিণ-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি মানুষ বর্তমানে তীব্র গরমের ঝুঁকিতে রয়েছেন। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বারবার সতর্ক করে বলছে, দীর্ঘ সময় খোলা জায়গায় অবস্থান, পর্যাপ্ত পানি পান না করা এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যে। সেখানে গরমজনিত কারণে ২২ জনের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে একজন এবং মিসিসিপিতে আরও দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার সঙ্গে তীব্র তাপপ্রবাহের সম্পর্ক খতিয়ে দেখছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর সোমবার পর্যন্ত নতুন করে একাধিক আবহাওয়া সতর্কতা জারি করেছে। পূর্ব উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বজ্রঝড়, প্রবল দমকা হাওয়া, শিলাবৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে ডেলাওয়ার, কানেকটিকাট এবং নিউইয়র্ক সিটিসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বন্যা সতর্কতার আওতায় রয়েছেন। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, কোথাও কোথাও প্রায় ৩ ইঞ্চি বা ৭ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা স্বল্প সময়ের মধ্যে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। ঝড়ো বাতাস ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে বহু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ফলে লাখো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাতাসের আর্দ্রতা ও উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা বা ‘হিট ইনডেক্স’ আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, বাল্টিমোর এবং ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলের মতো শহরগুলোতে অনুভূত তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৭ থেকে ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
যদিও পূর্ব উপকূলের কিছু এলাকায় সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় থেকে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া এবং অ্যারিজোনার ফিনিক্স ও টুসন শহরে মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
চরম গরমের স্বাস্থ্যগত প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নিউইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দাবদাহজনিত অসুস্থতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩৭৮ জনের বেশি মানুষ বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, শিশু, প্রবীণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং বাইরে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, শক্তিশালী ঝড় এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার মতো ঘটনাগুলো দেশের অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে শুধু জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিও এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

