হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হুমকি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা ভারত মহাসাগরকে আবারও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। একসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান আলোচনায় আটলান্টিক অঞ্চল, ভূমধ্যসাগর কিংবা প্রশান্ত মহাসাগর বেশি গুরুত্ব পেত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। ভারত মহাসাগর আর শুধু বাণিজ্যপথ নয়; এটি হয়ে উঠছে শক্তির প্রতিযোগিতা, সামরিক অবস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান মঞ্চ।
যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে তার কৌশলগত মনোযোগ ধীরে ধীরে এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের দিকে সরিয়ে নিচ্ছিল। এর পেছনে ছিল চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান, বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের বাড়তি প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থের প্রতি চীনের চ্যালেঞ্জ। ওয়াশিংটন আগে যেখানে আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে বেশি ব্যস্ত ছিল, সেখানে এখন চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তাকে এশিয়ার সমুদ্রপথগুলোর দিকে আরও গভীরভাবে তাকাতে বাধ্য করেছে।
কিন্তু ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ বা ব্যাহত করার সক্ষমতা ইরানের আছে—এমন আশঙ্কা শুধু পারস্য উপসাগর নয়, পুরো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। এই অঞ্চল দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ পণ্যবাহী কনটেইনার চলাচল করে এবং সমুদ্রপথে পরিবহন হওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ এই বৃহত্তর সামুদ্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে হরমুজে কোনো বড় সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর অভিঘাত পৌঁছাবে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।
নাটো এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট হিসেবে বিবেচিত। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও প্রশান্ত মহাসাগরকে তার প্রধান কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। তবু অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে ভারত মহাসাগর আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এই সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত আছে হরমুজ প্রণালী, মালাক্কা প্রণালী, বাব আল মানদেব প্রণালী, লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগরের নিকটবর্তী সমুদ্রপথ। এক অঞ্চলের অস্থিরতা খুব দ্রুত অন্য অঞ্চলের বাণিজ্য ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ভিক্টর ব্রুনোর মতে, ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব শুধু হরমুজের বর্তমান উত্তেজনার কারণে বাড়ছে না; এশিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতাও এই অঞ্চলকে অপরিহার্য করে তুলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারত মহাসাগর ছিল বিশ্বের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই সমুদ্রপথ ঐতিহাসিকভাবে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। আজও সেই বাস্তবতা বদলায়নি; বরং বিশ্বায়ন, জ্বালানি নির্ভরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের কারণে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে নতুন পর্যায়ে ঢুকেছে। এই বাস্তবতায় ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু একটি সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং এশিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তারের এক বড় সুযোগ। অতীতে যেমন এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে রুশ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল, তেমনি আজকের ভারত মহাসাগরেও এক নতুন ধরনের ক্ষমতার খেলা দেখা যাচ্ছে। ইতিহাসে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা “মহা খেলা” নামে পরিচিত ছিল, যেখানে ইরান থেকে মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান এবং ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলেছিল।
তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ভারত। ভারতকে বলা হতো সাম্রাজ্যের মুকুটের রত্ন। ভারত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্রিটেন ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার ও প্রভাব বজায় রাখতে পেরেছিল। এই অবস্থান রুশ সম্প্রসারণকে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে বাধা দিয়েছিল। বর্তমান সময়েও ভারতের অবস্থান, ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক পথ এবং আশপাশের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো একইভাবে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আগ্রহ পুনরুজ্জীবিত করেছে। এই দ্বীপপুঞ্জের ডিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যা ভারত মহাসাগরের মাঝামাঝি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত। অন্যদিকে চীন ইতোমধ্যে জিবুতিতে সামরিক উপস্থিতি তৈরি করেছে। জিবুতি পূর্ব আফ্রিকার একটি ছোট দেশ হলেও এটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত, ফলে বাব আল মানদেব প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।
চীন শুধু সামরিক উপস্থিতিই বাড়ায়নি; অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমেও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে। পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দর এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর চীনের বৃহত্তর সামুদ্রিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়। চীনের পথ ও বলয় উদ্যোগ এই অঞ্চলের অনেক দেশের বন্দর, রাস্তা, জ্বালানি করিডর এবং বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। এর ফলে ভারত মহাসাগর শুধু জাহাজ চলাচলের পথ নয়, নিজেই একটি বড় কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফ্রেদেরিজ গ্রারে এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ জঁ-লু সামান ভারত মহাসাগরকে নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের দৃষ্টিতে, দীর্ঘদিন ভারত মহাসাগরকে অনেকটা কৌশলগত শূন্যস্থান হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে ভারতসহ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য চীনের উপস্থিতি নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি করেছে।
ভারত নিজেও এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শক্তি। চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত ও কৌশলগত বিরোধের কারণে নয়াদিল্লি ভারত মহাসাগরে নিজের অবস্থান শক্ত করতে আগ্রহী। ভারতের নৌবাহিনী এই অঞ্চলের অন্যতম সক্ষম নৌবাহিনী হিসেবে বিবেচিত। ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশও ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ভারত মরিশাসের মতো ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, কারণ এসব দ্বীপ রাষ্ট্রের অবস্থান বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব আগে অনেক সময় শুধু বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো। কিন্তু এখন বিষয়টি আরও বিস্তৃত। এখানে জ্বালানি পরিবহন, সামরিক ঘাঁটি, বন্দর নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ শৃঙ্খল, আঞ্চলিক জোট, দ্বীপ রাষ্ট্রের কূটনীতি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করছে। সমুদ্রপথগুলো বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সামরিক জাহাজ ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রেও অপরিহার্য।
চীনের জিবুতিতে ঘাঁটি স্থাপন অনেক দেশের চোখ খুলে দিয়েছে। এর আগে ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি অনেকেই মূলত অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখত। কিন্তু সামরিক উপস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার পর আঞ্চলিক শক্তিগুলো বুঝতে পারে, এই সমুদ্রপথ ভবিষ্যৎ ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদিও প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে মনোযোগ দিতে চায়, তবু ভারত মহাসাগরের স্থিতিশীলতা ছাড়া তার বৃহত্তর এশীয় কৌশল সফল হওয়া কঠিন।
ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় প্রশ্ন হলো—ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদার কি ভারত মহাসাগরের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট ভূমিকা নিতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে নিজেকে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রধান রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ও ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদি ওয়াশিংটন একই সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরে নিরাপত্তা সামাল দিতে চায়, তবে তার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
এই অনিশ্চয়তা আঞ্চলিক দেশগুলোকে নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ, নৌ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বহুমুখী নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়তে উৎসাহিত করছে। একদিকে নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে একই পদক্ষেপকে প্রতিবেশী দেশ হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। ফলে নতুন নিরাপত্তা দ্বিধা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভুল হিসাব, সামরিক উত্তেজনা বা সীমিত সংঘর্ষ বড় আকার নিতে পারে।
ভারত মহাসাগরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সংকটকেন্দ্র বাব আল মানদেব প্রণালী। ইয়েমেনের হুথিরা, যারা ইরানঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার হুমকি দিয়েছে। বাব আল মানদেব প্রণালী লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১৪ শতাংশ চলাচল করে। ফলে এই পথের নিরাপত্তা ব্যাহত হলে তা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
শুধু হরমুজ বা বাব আল মানদেব নয়, আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলও নতুন উত্তেজনার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। সোমালিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে সোমালিল্যান্ডকে ঘিরে। সোমালিল্যান্ড নিজেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও সোমালিয়া এটিকে নিজের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ মনে করে। লোহিত সাগরের নিকটবর্তী উপকূলীয় অবস্থানের কারণে সোমালিল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। এ কারণে বাইরের শক্তিগুলোর আগ্রহও বাড়ছে।
তুরস্ক সোমালিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে মোগাদিশুর আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে জোরালোভাবে সমর্থন করছে। তুরস্কের দৃষ্টিতে সোমালিয়াকে আরও ভাঙনের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন কোনো নীতি পুরো অঞ্চলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফেব্রুয়ারিতে আঙ্কারা ও মোগাদিশু একটি বড় প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তি সই করে। এই চুক্তির লক্ষ্য নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদার করা।
সোমালি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদিনোর দাহিরের মতে, ভারত মহাসাগরের প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভারত, আরব আঞ্চলিক শক্তি, তুরস্ক এবং আরও কয়েকটি দেশ এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন, বহুমেরুকরণ, মুক্ত বাণিজ্যনির্ভর বিশ্বায়ন থেকে কৌশলগত জাতীয়তাবাদের দিকে ঝোঁক—সব মিলিয়ে ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠছে। এখানে কোনো একক শক্তি পুরো অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে না। ফলে অঞ্চলটি একই সঙ্গে বিভক্ত, প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং ভঙ্গুর।
এই পরিবর্তন ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য সুযোগও তৈরি করছে, আবার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। সেশেলস, মালদ্বীপ ও মরিশাসের মতো দেশগুলো এখন একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। তারা কখনো ভারতের সঙ্গে, কখনো চীনের সঙ্গে, কখনো যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। ভারত মহাসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সংগঠনেও নানা ধরনের স্বার্থ জড়িত। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, কেনিয়া, ফ্রান্স ও ভারত—সবাই একই বৃহত্তর অঞ্চলের অংশ হলেও তাদের স্বার্থ সব সময় এক নয়।
এই প্রতিযোগিতার ইতিহাস অনেক পুরোনো। পাঁচ শতাব্দী আগে ভারত মহাসাগর ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্য ও পর্তুগালের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। উসমানীয়রা ছিল সে সময়ের বড় মুসলিম নৌশক্তি, আর পর্তুগাল ছিল ইউরোপের প্রধান সামুদ্রিক শক্তিগুলোর একটি। তারা গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, প্রণালী ও বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করেছে। আজকের ভাষায় যাকে সমুদ্র যোগাযোগপথ বলা হয়, তখনও সেই পথ নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
গবেষক গুলিজার মানাভ উলুদাগ মনে করেন, হরমুজ প্রণালী থেকে বাব আল মানদেব, এডেন উপসাগর এবং পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় ও মুসলিম শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাই আধুনিক সামুদ্রিক কৌশলগত চিন্তার ভিত্তি তৈরি করেছে। তাঁর মতে, প্রায় ৫০০ বছর পরও ভারত মহাসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কমেনি; বরং বিশ্বায়নের কারণে তা আরও বেড়েছে।
ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু পিককও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, ইতিহাসে যে বিখ্যাত রেশমপথের কথা বলা হয়, তার বড় অংশ আসলে স্থলপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথেও বিস্তৃত ছিল। চীন থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেখান থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের জন্য ভারত মহাসাগর ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চল একদিকে বাইরের শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ছিল, অন্যদিকে স্থানীয় রাষ্ট্র ও শক্তিগুলোও বড় সাম্রাজ্যের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পেত।
এই ঐতিহাসিক ধারা আজও দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, হুথিদের জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার হুমকি, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে নতুন আগ্রহ—সবকিছু মিলিয়ে পুরোনো কৌশলের নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। অতীতে পর্তুগিজরা মোম্বাসা থেকে মালাক্কা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর দখলের চেষ্টা করেছিল। আজও বড় শক্তিগুলো একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ, বন্দর ও প্রণালী নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী।
১৬২২ সালে ইরানের সাফাভি শাসক শাহ আব্বাস প্রথম পর্তুগিজদের কাছ থেকে হরমুজ দখল করেছিলেন। এই ঘটনা দেখায়, হরমুজের মতো প্রণালী বহু শতাব্দী ধরেই ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্র। আজকের দিনে আধুনিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং নৌ অবরোধের প্রযুক্তি আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। ফলে কোনো রাষ্ট্র বা সশস্ত্র গোষ্ঠী চাইলে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা আগের চেয়ে সহজ এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
এই কারণেই হরমুজ, বাব আল মানদেব বা মালাক্কার মতো সংকীর্ণ সমুদ্রপথ শুধু মানচিত্রের একটি অংশ নয়; এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির শিরা-উপশিরা। একটি পথ বন্ধ হলে জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথ নিতে হয়, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, জ্বালানির দাম অস্থির হয় এবং বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাই ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা শুধু সামরিক বিষয় নয়; এটি খাদ্য, জ্বালানি, শিল্প উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও যুক্ত।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ১৬শ শতকের উসমানীয়-পর্তুগিজ প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় নতুন শক্তিগুলো এসেছে। চীন আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াচ্ছে। ভারত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে নিজের সামুদ্রিক কৌশল জোরদার করছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের নিরাপত্তা অংশীদারত্বও এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে।
তবে বর্তমান প্রতিযোগিতা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না। বন্দর বিনিয়োগ, জ্বালানি করিডর, বাণিজ্যিক রুট, সরবরাহ শৃঙ্খল, নৌঘাঁটি, দ্বীপ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, ঋণনীতি এবং অবকাঠামো নির্মাণ—সবকিছু মিলিয়ে ভারত মহাসাগর এখন বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র। কোনো দেশ শুধু যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে প্রভাব ধরে রাখতে পারবে না; তাকে অর্থনীতি, কূটনীতি, উন্নয়ন সহায়তা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা—সব দিকেই সক্রিয় থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত মহাসাগরে এখন একক কোনো শক্তির পূর্ণ আধিপত্য নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বড় সামরিক শক্তি, চীন দ্রুত প্রভাব বাড়াচ্ছে, ভারত নিজের আঞ্চলিক অবস্থান শক্ত করছে, তুরস্ক ও আরব শক্তিগুলোও সক্রিয় হচ্ছে, আর ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বহু দিকেই সম্পর্ক গড়ছে। এই বহুমুখী প্রতিযোগিতা একদিকে ভারসাম্যের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
হরমুজ ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা তাই শুধু একটি সাময়িক সংকট নয়। এটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতীক। বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে এমন এক সমুদ্র অঞ্চলে সরে আসছে, যেখানে বাণিজ্য, জ্বালানি, সামরিক শক্তি, ইতিহাস এবং ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ভারত মহাসাগরকে যারা শুধু জলরাশি হিসেবে দেখে, তারা আসলে ভবিষ্যৎ বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান মঞ্চকে বুঝতে ব্যর্থ হবে।
আগামী বছরগুলোতে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে বড় শক্তিগুলোর সংযম, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক দক্ষতা এবং ছোট দ্বীপ ও উপকূলীয় দেশগুলোর ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতার ওপর। হরমুজের উত্তাপ, বাব আল মানদেবের ঝুঁকি, চাগোসের কৌশলগত গুরুত্ব, জিবুতিতে চীনের উপস্থিতি, ভারতের নৌকৌশল এবং তুরস্কের আফ্রিকা নীতি—সব মিলিয়ে ভারত মহাসাগর এখন আর প্রান্তিক অঞ্চল নয়। এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভবিষ্যৎ মানচিত্র আঁকার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।

