প্রশান্ত মহাসাগরের উন্মুক্ত জলসীমায় নতুন করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে চীন। বেইজিং বলছে, এটি তাদের বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ এবং পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ পরিকল্পনা অনুযায়ী সফল হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপকে ঘিরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ০১ মিনিটে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি-এর একটি কৌশলগত পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। চীনের নৌবাহিনীর মুখপাত্র ওয়াং জুয়েমেং জানান, পরীক্ষামূলক এই ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি ডামি ওয়ারহেড বহন করছিল এবং নির্ধারিত সমুদ্র এলাকায় নিখুঁতভাবে আঘাত হানে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো অভিযানটি পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে।
চীনের দাবি, এই পরীক্ষা কোনো আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি তাদের নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ। বেইজিং আরও জানিয়েছে, পরীক্ষার আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল, যাতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বা নৌ চলাচলে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়।
এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার খবর সামনে আসে এমন এক সময়ে, যখন চীনের পূর্বাঞ্চলের চিংদাও উপকূলে চীন ও রাশিয়ার যৌথ নৌ মহড়া শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। ফলে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এই পরীক্ষা কেবল নিয়মিত সামরিক অনুশীলনের অংশ, নাকি বৃহত্তর সামরিক কৌশলেরও একটি ইঙ্গিত। যদিও চীনের পক্ষ থেকে এ দুই ঘটনার মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়নি।
পরীক্ষার আগে পাপুয়া নিউগিনি এবং নিউজিল্যান্ড জানিয়েছিল, চীন তাদের সম্ভাব্য একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়ে আগাম সতর্ক করেছে। পাপুয়া নিউগিনির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাস্টিন টিকাটচেঙ্কো জানান, চীনের রাষ্ট্রদূত ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে এ বিষয়ে তাকে অবহিত করেছিলেন। একই ধরনের তথ্য নিশ্চিত করেছে নিউজিল্যান্ড সরকারের একটি সূত্রও।
তবে আগাম সতর্কতা দেওয়া হলেও ক্ষেপণাস্ত্রটি ঠিক কোন এলাকায় গিয়ে পড়বে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানানো হয়নি। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ থেকেই যায়।
চীনের এই পদক্ষেপ নতুন নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটি ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পর সেটিই ছিল আন্তর্জাতিক জলসীমায় চীনের প্রথম এমন পরীক্ষা। সে সময় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, পরীক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল ডংফেং-৩১ সিরিজের, যা পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বহনে সক্ষম। ক্ষেপণাস্ত্রটি এমন একটি এলাকায় পড়েছিল, যা আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। যুদ্ধজাহাজের টহল, সাবমেরিন কার্যক্রম, যৌথ সামরিক মহড়া এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশলেরই অংশ বলে তারা মনে করছেন।
এদিকে গত মাসে নিউজিল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি অভ্যন্তরীণ নথি প্রকাশ্যে আসে, যেখানে সতর্ক করে বলা হয়েছিল যে প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের নৌ-অভিযান ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ভবিষ্যতে আরও নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। সেই পূর্বাভাসের পরপরই সর্বশেষ এই পরীক্ষাকে অনেকেই ওই মূল্যায়নের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

