দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে নিরাপত্তা কাঠামো পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই ন্যাটো এখন এক বড় রূপান্তরের মুখে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের নীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, ওয়াশিংটন আর আগের মতো ইউরোপের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়। বরং ইউরোপীয় দেশগুলোকেই এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ভার বেশি করে বহন করতে বলা হচ্ছে।
ন্যাটোর জন্ম হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক প্রভাব ঠেকানোর প্রেক্ষাপটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর পশ্চিমা দেশগুলো বুঝেছিল, ইউরোপের নিরাপত্তা শুধু ইউরোপের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত। সেই ধারণা থেকেই ১২টি দেশ মিলে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো গঠন করে। মূল লক্ষ্য ছিল, কোনো সদস্য দেশ বহিরাগত হামলার শিকার হলে অন্য সদস্যরা তার পাশে দাঁড়াবে।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই পুরোনো বাস্তবতা আর আগের মতো নেই। বিশ্ব রাজনীতি পাল্টেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার বদলেছে, ইউরোপে রাশিয়ার হুমকি আবার বড় হয়ে উঠেছে, আর ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটোকে নতুন চোখে দেখতে চাইছে। এই পরিবর্তন শুধু কূটনৈতিক ভাষার পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেনা মোতায়েন, প্রতিরক্ষা ব্যয়, সামরিক নেতৃত্ব এবং ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনা।
বর্তমানে ন্যাটোর সদস্যসংখ্যা ৩২। আগামী ৭ ও ৮ জুলাই তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ন্যাটো সম্মেলন। এই সম্মেলনের কেন্দ্রে থাকবে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্র যদি আগের মতো সক্রিয় না থাকে, তাহলে ন্যাটো কীভাবে চলবে? আরও সরাসরি বললে, ইউরোপ কি নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজে নিতে প্রস্তুত?
যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার নতুন নীতি
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ন্যাটো নিয়ে তাঁর অসন্তোষ বারবার প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভর করেছে, কিন্তু নিজেদের প্রতিরক্ষায় যথেষ্ট বিনিয়োগ করেনি। তাঁর দৃষ্টিতে, এই জোট ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে—খরচের বড় অংশ বহন করছে যুক্তরাষ্ট্র, আর নিরাপত্তার সুবিধা ভোগ করছে ইউরোপ।
ট্রাম্পের অসন্তোষ আরও বাড়ে যখন ইরান যুদ্ধের সময় ইউরোপীয় মিত্ররা প্রত্যাশিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়নি। এরপর ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি—অনুচ্ছেদ পাঁচ—নিয়েও তিনি অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেন। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশ আক্রমণের শিকার হলে তা পুরো জোটের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এতদিন এই নীতি ন্যাটোর সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখা হতো।
কিন্তু ট্রাম্প যখন এই প্রতিশ্রুতি সব সময় মানা হবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহের ইঙ্গিত দেন, তখন ইউরোপের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র যদি সেই অঙ্গীকারে শর্ত জুড়ে দেয়, তাহলে পুরো জোটের ভিত্তিই দুর্বল হতে পারে।
শুরুতে বিষয়টি অনেকের কাছে রাজনৈতিক চাপ বা দর-কষাকষির কৌশল মনে হলেও এখন তা নীতিগত অবস্থানে রূপ নিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করেছে, ইউরোপকে নিজেদের মহাদেশ রক্ষায় নেতৃত্ব নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে বেশি মনোযোগ দিতে চায়। ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক সামরিক কৌশল নথিতেও ‘পশ্চিম গোলার্ধে’ বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সেনা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত ও ইউরোপের অস্বস্তি
গত মে মাসে ওয়াশিংটন হঠাৎ জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্ত বার্লিনের জন্য যেমন অস্বস্তিকর ছিল, তেমনি ন্যাটোর শীর্ষ নেতৃত্বকেও বিব্রত করে। একই সঙ্গে পোল্যান্ডে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার কথাও জানায় যুক্তরাষ্ট্র।
যদিও পরে ট্রাম্প ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন, তবু বার্তাটি পরিষ্কার হয়ে যায়—যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তার সামরিক উপস্থিতি কমানোর বিষয়ে ভাবছে। পেন্টাগন মিত্রদের জানায়, ন্যাটোর দেশগুলোতে সেনা ও অস্ত্র মোতায়েনের মাত্রা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা তারা বিবেচনা করছে। পরবর্তী ছয় মাস ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সেনা রাখার প্রয়োজনীয়তা যাচাই-বাছাই করা হবে বলেও জানানো হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সাম্প্রতিক বক্তব্যও একই ধারার। তিনি বলেছেন, ন্যাটোকে ভারসাম্যপূর্ণ জোটে পরিণত করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে এবং ইউরোপকে নিজেদের সুরক্ষায় নেতৃত্ব নিতে হবে। তাঁর বক্তব্যের মূল অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো ছাড়ছে না, কিন্তু জোটের ভার আর একা বহন করতে চায় না।
এই অবস্থান ইউরোপের জন্য বড় ধাক্কা হলেও একে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত বলা যায় না। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসন ইউরোপকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছিল। ট্রাম্প শুধু সেই চাপকে আরও কঠোর ও সরাসরি করে তুলেছেন।
ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দৌড়
২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপের নিরাপত্তা ধারণায় বড় পরিবর্তন আসে। এতদিন যেসব দেশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ে সতর্ক বা অনাগ্রহী ছিল, তারাও বুঝতে শুরু করে যে যুদ্ধ ইউরোপের বাইরে কোনো দূরের বিষয় নয়। রাশিয়ার সামরিক পদক্ষেপ ইউরোপকে তার নিরাপত্তা দুর্বলতা নতুন করে দেখতে বাধ্য করে।
ট্রাম্পের চাপ এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে। কয়েক দশক ধরে ইউরোপের বহু দেশ ন্যাটোর নির্ধারিত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। গত বছরের সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো ২০৩৫ সাল নাগাদ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির পাঁচ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য গ্রহণ করে।
এটি শুধু বাজেট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; এর রাজনৈতিক অর্থও বড়। ইউরোপ বুঝতে পারছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার পুরোনো যুগ হয়তো শেষের পথে। ইউরোপ ও কানাডা সম্মিলিতভাবে এমন পর্যায়ে যেতে চাইছে, যেখানে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের অবদানকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই রূপান্তরে জার্মানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সীমান্তবর্তী কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ন্যাটোর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে।
একজন ইউরোপীয় কূটনীতিবিদের ভাষায়, জোটের ভেতরে এক ধরনের ‘বিপ্লব’ ঘটে গেছে। এই মন্তব্যের পেছনে বাস্তবতা আছে। কারণ ন্যাটো এতদিন মূলত মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক কাঠামো হিসেবে কাজ করলেও এখন ধীরে ধীরে ইউরোপীয় অংশের গুরুত্ব বাড়ছে।
পরিবর্তন কি শুধু ট্রাম্পের কারণে
অনেকে মনে করতে পারেন, ন্যাটোর এই অস্থিরতা শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নীতি বা রাজনৈতিক কৌশলের ফল। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি আরও গভীর। জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ক্লদিয়া মেজর বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, এটি শুধু ট্রাম্পের বিষয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত পরিবর্তন।
এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকেই মনে করেন ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত খরচ করা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। ট্রাম্প এই মনোভাবকে আরও জোরালোভাবে প্রকাশ করছেন, কিন্তু তাঁর পরেও এই নীতি পুরোপুরি বদলে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
অর্থাৎ ইউরোপের সামনে যে প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে, তা সাময়িক নয়। ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ধীরে ধীরে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে নিজের ভূমিকা কমাতে চাইবে। ফলে ইউরোপকে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে।
এখন পর্যন্ত বাস্তবে কী বদলেছে
বড় বড় বক্তব্য, ঘোষণা ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে পরিবর্তন এখনো সীমিত। এখনো ইউরোপজুড়ে ৮০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ন্যাটোপন্থি শক্তিশালী কণ্ঠ আছে, যারা মনে করে ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বজায় রাখা ওয়াশিংটনের নিজস্ব স্বার্থের জন্যও জরুরি।
এছাড়া ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থাও এখনো বহাল আছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই বিষয়ে কোনো পরিবর্তনের কথা বলেনি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এখনো ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামো থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি।
তবে রূপান্তরের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ন্যাটোর আঞ্চলিক সদরদপ্তরগুলোতে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ভূমিকা বাড়ছে। কিন্তু স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর সামরিক নিয়ন্ত্রণ এখনো অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে। ফলে ন্যাটো বদলাচ্ছে, কিন্তু সেই বদল ধীর এবং অসম্পূর্ণ।
একজন কূটনীতিবিদের মতে, ন্যাটো ধীরে ধীরে নতুন রূপ নিচ্ছে এবং কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, জোট ভেঙে যাচ্ছে না; বরং ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।
ন্যাটোর জন্য এটি সংকট, নাকি সুযোগ
ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এখনই কেউ জোটের অকাল মৃত্যুর কথা বলছে না। যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি বিদায় নেবে, অথবা ইউরোপকে আলাদা সামরিক জোট গঠন করতে হবে—এমন অবস্থাও এখনো তৈরি হয়নি। তবে এ কথা স্পষ্ট যে ন্যাটোর পুরোনো কাঠামো আর আগের মতো থাকবে না।
আঙ্কারার সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে—কীভাবে শক্তিশালী ন্যাটো এবং শক্তিশালী ইউরোপ একসঙ্গে গড়ে তোলা যায়। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে যতটা সম্ভব জোটের সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা চলবে। কারণ ইউরোপ যতই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াক, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা, পরমাণু প্রতিরোধ এবং বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতির বিকল্প দ্রুত তৈরি করা সহজ নয়।
বিশেষ করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং দ্রুত সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের মতো ক্ষেত্রে ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এসব ঘাটতি পূরণ করতে সময়, অর্থ এবং রাজনৈতিক ঐক্য—সবই দরকার।
ইউক্রেন থাকবে ইউরোপীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রে
আগামী দিনের ইউরোপীয় নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রে থাকবে ইউক্রেন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনই একমাত্র দেশ, যে সরাসরি বৃহৎ সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে এবং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা ইউক্রেনকে ইউরোপীয় নিরাপত্তা আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে আপাতত ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করার বাস্তবসম্মত পথ নেই। এর কারণ রাজনৈতিক ও সামরিক—দুই ধরনের। ইউক্রেনকে জোটে নেওয়া মানে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ পাঁচ সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া এবং তাকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্ন—দুটিকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষণ: ন্যাটোর ভেতরে আসল পরিবর্তন কোথায়
ন্যাটোর ভেতরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে মানসিকতায়। এতদিন ইউরোপ জানত, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবে। এখন সেই নিশ্চয়তা দুর্বল হয়েছে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো বুঝছে, নিরাপত্তা শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না; এর জন্য সেনাবাহিনী, অস্ত্র, অর্থ, শিল্প সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
দ্বিতীয় পরিবর্তন হচ্ছে নেতৃত্বে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রধান শক্তি, কিন্তু ইউরোপকে সামনে আসতে বলা হচ্ছে। এর অর্থ হলো, ইউরোপকে শুধু বেশি টাকা খরচ করলেই চলবে না; তাকে কৌশলগত সিদ্ধান্তও নিতে হবে। কোন হুমকিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কোথায় সেনা মোতায়েন হবে, কোন অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো হবে, কোন দেশ কত দায়িত্ব নেবে—এসব প্রশ্নের উত্তর ইউরোপকেই খুঁজতে হবে।
তৃতীয় পরিবর্তন হলো ন্যাটোর ভেতরের রাজনৈতিক ভারসাম্যে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব কমলে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তা চিন্তা এক নয়। পূর্ব ইউরোপ রাশিয়াকে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখে। পশ্চিম ইউরোপের কিছু দেশ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দক্ষিণ ইউরোপের উদ্বেগ আবার অভিবাসন, ভূমধ্যসাগরীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা ঘিরে। এই ভিন্ন অগ্রাধিকারকে এক নীতিতে রূপ দেওয়া সহজ হবে না।
ন্যাটো ভাঙছে না, কিন্তু বদলে যাচ্ছে
ট্রাম্পের নীতি ন্যাটোকে এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো ইউরোপের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ ভার নিতে চায় না। ইউরোপকে বলা হচ্ছে, নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই বেশি করে সামলাতে হবে। এই বার্তা ইউরোপের জন্য অস্বস্তিকর হলেও তা এক ধরনের সতর্ক সংকেতও।
ন্যাটো এখনই ভেঙে পড়ছে না। ইউরোপে এখনো ৮০ হাজার মার্কিন সেনা আছে, যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থা বহাল আছে, আর সামরিক কমান্ড কাঠামোতেও ওয়াশিংটনের প্রভাব প্রবল। কিন্তু ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা বদলে গেছে। জোটের পুরোনো প্রশ্ন ছিল—যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইউরোপকে রক্ষা করবে। নতুন প্রশ্ন হলো—ইউরোপ কত দ্রুত নিজের সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে পারবে, আর যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা পাশে রাখতে পারবে।
আঙ্কারার ২০২৬ সালের ন্যাটো সম্মেলন তাই শুধু আরেকটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়। এটি হতে পারে ন্যাটোর নতুন যুগের সূচনা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু আগের মতো একক অভিভাবক হিসেবে নয়; আর ইউরোপ থাকবে, তবে আগের চেয়ে বেশি দায়িত্ব, বেশি ব্যয় এবং বেশি রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে।

