ভেনেজুয়েলায় গত সপ্তাহে আঘাত হানা শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশটি। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা, স্পষ্ট হচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞের প্রকৃত চিত্র। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, এই দুর্যোগে ৩ হাজার ৫৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৭৪০ জন, আর ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১৮ হাজার মানুষ। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে দেশটি একটি বড় স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
সোমবার (৬ জুলাই) দেশটির আইনপ্রণেতা জর্জ রদ্রিগেজ সর্বশেষ হতাহতের তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের আশ্রয় দিতে এসব এলাকায় ৮০টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে অন্তত ১২ হাজার ৮০০ মানুষ অবস্থান করছেন।
দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি দিন দিন আরও হৃদয়বিদারক হয়ে উঠছে। লা গুয়াইরায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ট্রাকভর্তি কফিন একের পর এক বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অনেক জায়গায় খোলা মাঠে ভারী যন্ত্র দিয়ে গণকবর খনন করে নিহতদের দাফন করা হচ্ছে। সাদা ক্রস দিয়ে চিহ্নিত সেই কবরগুলোর দৃশ্য দেশজুড়ে শোকের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই বিপর্যয়ের সূচনা হয় গত ২৪ জুন, যখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় আঘাত হানে। প্রবল কম্পনে প্রায় ৬০ হাজার ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। বহু পরিবার মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলে তাদের বহু বছরের গড়ে তোলা বসতবাড়ি।
বর্তমানে হাজার হাজার মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। অনেক আহত ব্যক্তি এখনও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না, ফলে তাদের শারীরিক অবস্থাও ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
কারাকাসের হোসে গ্রেগোরিও হার্নান্দেজ হাসপাতালের ট্রমা ইউনিটের প্রধান ইউহেনিও কোভা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় চিকিৎসাহীন অবস্থায় থাকা আহতদের মধ্যে সংক্রমণের আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। তার মতে, গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু আহতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও ইতোমধ্যে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দারা বলছেন, সেখানে বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে, পর্যাপ্ত বহনযোগ্য শৌচাগার নেই এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা জরুরি ভিত্তিতে সরকারের সহায়তা দাবি করেছেন।
এদিকে উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভও বাড়ছে। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক ও মানবিক সহায়তাকর্মীরাই নিজেদের উদ্যোগে ধ্বংসস্তূপ সরানো, জীবিতদের খোঁজ, ত্রাণ বিতরণ এবং উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
মানবাধিকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটন অফিস অন লাতিন আমেরিকা-এর সভাপতি ক্যারোলিনা হিমেনেজ বলেছেন, এমন বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাষ্ট্রের সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসার কথা। কিন্তু ভেনেজুয়েলায় বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তার অভিযোগ, সরকারি সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে পৌঁছাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর উত্তরের কাতিয়া লা মারসহ কয়েকটি এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা পৌঁছেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার সামনে এখন সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঠেকানো। কারণ উদ্ধার অভিযান যত দীর্ঘ হবে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতির উন্নতি যত বিলম্বিত হবে, ততই সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে

