তুরস্কে শুরু হতে যাওয়া ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগমুহূর্তে ইউক্রেনে আবারও বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে এটি ছিল রাজধানী কিয়েভের ওপর দ্বিতীয় ভয়াবহ হামলা। এতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০ জন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়েছেন। হামলার ফলে বহু আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং রাজধানীজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় সময় সোমবার (৬ জুলাই) ভোরে এই হামলা শুরু হয়। কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো জানান, রাজধানী কিয়েভেই ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া শহরের আশপাশের জেলাগুলোতে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সেখানে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাতভর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫১টি ড্রোন নিক্ষেপ করে রুশ বাহিনী। এত বিপুল সংখ্যক আকাশপথের হামলা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাত আনুমানিক ১টা ৪০ মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর ২টা ১০ মিনিট এবং ৩টা ১৫ মিনিটে আরও কয়েক দফা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে রাজধানী। একের পর এক হামলার কারণে পুরো ইউক্রেনজুড়ে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজতে থাকে। নিরাপত্তার জন্য হাজার হাজার মানুষ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যান।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এক ডজনেরও বেশি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জরুরি সেবাও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এই হামলার মাত্র একদিন আগে, রোববার (৫ জুলাই) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করেছিলেন যে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগে রাশিয়া নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। তার সেই আশঙ্কাই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাস্তবে পরিণত হলো।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) তুরস্কে শুরু হচ্ছে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলমান যুদ্ধ, ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং পশ্চিমা সামরিক সহযোগিতাই হবে বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয়।
এর আগেও গত সপ্তাহের শেষ দিকে কিয়েভে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল রাশিয়া। তখন ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র ও শত শত ড্রোনের আঘাতে অন্তত ৩১ জন নিহত হন। চলতি বছরে রাজধানীতে সেটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
এদিকে যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের একটি সমাধান “মানুষ যতটা ভাবছে, তার চেয়েও কাছাকাছি” চলে এসেছে। তবে তিনি যুদ্ধবিরতির আলোচনা কতদূর এগিয়েছে বা সম্ভাব্য সমাধানের রূপরেখা কী হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো সম্মেলনের আগে এই ব্যাপক হামলা শুধু সামরিক অভিযান নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তাও হতে পারে। একদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার আগে চাপ সৃষ্টি—দুই লক্ষ্যই এই হামলার পেছনে কাজ করতে পারে বলে তারা মনে করছেন। ফলে ন্যাটো সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধ আবারও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

