যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতার পর এবার উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে পাকিস্তান। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইসলামাবাদ ইতোমধ্যে লিবিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বের মধ্যে নীরবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—দেড় দশকের বিভক্তি কাটিয়ে দেশটিকে আবার একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে পাকিস্তান শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার কূটনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।
গাদ্দাফির পতনের পর থেকেই বিভক্ত লিবিয়া
২০১১ সালে ন্যাটো-সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকেই লিবিয়া কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে জাতিসংঘ-স্বীকৃত পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকার, অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলভিত্তিক শক্তিশালী সামরিক জোট। এই বিভাজনের কারণে গত দেড় দশকে দেশটিতে একাধিকবার সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে লিবিয়ার রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। সেই উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় করেই পাকিস্তান আলোচনায় যুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ট্রাম্পও অবগত, সমর্থনে সৌদি আরব
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিবিয়া নিয়ে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতা সম্পর্কে অবগত রয়েছেন এবং পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছেন।
এছাড়া পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা অংশীদার সৌদি আরবও এই উদ্যোগকে সমর্থন দিচ্ছে। জানা গেছে, গত বছরের শেষ দিকে লিবিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় পক্ষই পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা কামনা করলে এই আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
কেমন হতে পারে নতুন ক্ষমতা ভাগাভাগির কাঠামো
আলোচনায় থাকা খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল কনসেনসাস অ্যান্ড প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল’ নামে একটি নতুন অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনে ৩৬ মাসের ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলের জাতিসংঘ-সমর্থিত সরকারের প্রধান আবদুলহামিদ দ্বিবাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলীয় লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি-এর ডেপুটি কমান্ডার সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হবেন।
তেলসম্পদ ও বাজেট নিয়েও আলাদা পরিকল্পনা
লিবিয়ার অধিকাংশ তেলক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বর্তমানে খলিফা হাফতার-এর নিয়ন্ত্রণাধীন। এ কারণে প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় তাকে জাতীয় বাজেট-সংক্রান্ত কিছু বিশেষ ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে পুরো অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়া কার্যকর রাখতে পাকিস্তান সক্রিয় সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করবে বলে আলোচনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে, পরিকল্পনাটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি; বিভিন্ন পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে এতে পরিবর্তন আসতে পারে।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা
গত মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির রাওয়ালপিন্ডিতে সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের কয়েক দিন পর সাদ্দাম হাফতার ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ওয়াশিংটন লিবিয়ার রাজনৈতিক ঐক্যের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে এবং দেশটির নেতাদের বিভেদ দূর করে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পাকিস্তান
বিশ্লেষকদের মতে, লিবিয়ার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, মিশর কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হলেও পাকিস্তানের একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশটির সঙ্গে লিবিয়ার দুই পক্ষেরই দীর্ঘদিনের কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে।
পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বহুদিনের। জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার পরও অতীতে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহের মতো সামরিক সহযোগিতা নিয়ে দুই পক্ষের সম্পর্ক বজায় ছিল। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারও সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক সংলাপে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তুরস্ক ও কাতারের সমর্থন, তবে রয়েছে শঙ্কাও
পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারের প্রধান সমর্থক তুরস্ক ও কাতার এই মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদকে উৎসাহ দিয়েছে।
তবে সব পক্ষ একমত হলেও যে শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূরাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনফরমম-এর পরিচালক তারেক মেগেরিসি বলেন, কেবল একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হয় না। তিনি উদাহরণ হিসেবে গত বছর রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর মধ্যে হওয়া একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যা কয়েক মাসের মধ্যেই ভেঙে যায়।
এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই
এখন পর্যন্ত পাকিস্তান, লিবিয়ার কোনো পক্ষ কিংবা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, তুরস্ক বা কাতারের পক্ষ থেকে আলোচনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের ধারণা, যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত ও বিভাজনে জর্জরিত লিবিয়ার জন্য নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

