বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট হিসেবে ন্যাটোকে সাধারণত রাশিয়া, চীন বা অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির চোখ দিয়ে দেখা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ৬ জুলাই প্রকাশিত আহমেত দাভুতোগলুর বিশ্লেষণে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা আরও গভীর: ন্যাটোর সবচেয়ে বড় হুমকি কি সত্যিই বাইরে, নাকি জোটের ভেতরেই তার আসল দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে? ৭–৮ জুলাই আঙ্কারায় ন্যাটো নেতাদের বৈঠকের আগে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ন্যাটোর সামনে সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি নেই। তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর হাতে বিপুল সামরিক শক্তি, উন্নত প্রযুক্তি, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু কোনো সামরিক জোট কেবল অস্ত্র দিয়ে টিকে থাকে না। একটি জোট টিকে থাকে একটি সাধারণ লক্ষ্য, মূল্যবোধ, রাজনৈতিক আস্থা এবং নৈতিক বৈধতার ওপর। সেই জায়গাতেই আজ ন্যাটোর বড় সংকট দেখা যাচ্ছে। প্রশ্নটি তাই খুব সরল হলেও অত্যন্ত কঠিন: ন্যাটো আসলে কী রক্ষা করছে?
১৯৪৯ সালে ন্যাটো গঠনের সময় উত্তরটি তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা পশ্চিমা দেশগুলো সোভিয়েত সম্প্রসারণ ঠেকাতে এবং কথিত মুক্ত বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই জোট তৈরি করেছিল। কিন্তু শুধু সামরিক প্রতিরক্ষা নয়, তখন এর পেছনে আরও বড় একটি রাজনৈতিক দর্শন ছিল। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, উন্মুক্ত অর্থনীতি, পশ্চিমা ভূরাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আইন—এই চারটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক ব্যবস্থার ধারণা।
সমস্যা হলো, আজ এই চারটি ভিত্তিই চাপের মুখে। প্রথম সংকটটি রাজনৈতিক পরিচয়ের। ন্যাটো নিজেকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু জোটের ভেতরেই যখন গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এবং নীতিগত দ্বিচারিতা দেখা যায়, তখন তার নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো যায়, কিন্তু নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে মিত্রদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে বহু ন্যাটো সরকারের অবস্থান এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যখন গণহত্যা এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ পরীক্ষা করছে, তখন জোটের কয়েকটি প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্র—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—ইসরায়েলি সরকারের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ন্যাটোর ঘোষিত মূল্যবোধ এবং বাস্তব নীতির মধ্যে ফাঁক আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
এখানেই ন্যাটোর সবচেয়ে বড় নৈতিক দ্বন্দ্ব। যে জোটের ঐতিহাসিক বৈধতা ফ্যাসিবাদ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধোত্তর অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত, সেই জোট যদি মানবিক নীতির প্রশ্নে বাছাই করা ন্যায়বিচার দেখায়, তাহলে তার বক্তব্য দুর্বল হয়ে যায়। নৈতিক সামঞ্জস্য কোনো বিলাসিতা নয়; আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি কৌশলগত শক্তির অংশ। ন্যাটো যদি নিজের ঘোষিত নীতির প্রতিই অটল থাকতে না পারে, তবে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তার নৈতিক ভাষা কম কার্যকর হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয় সংকট অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। যুদ্ধোত্তর পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে মুক্ত বাণিজ্য, নিয়মভিত্তিক লেনদেন এবং বাজার উন্মুক্ততার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে শুধু বাইরের শক্তি নয়, ন্যাটোর ভেতরের দেশগুলোও। সংরক্ষণবাদ, শুল্কযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার প্রবণতা সেই ব্যবস্থাকেই আঘাত করছে, যা পশ্চিমা দেশগুলো ১৯৪৫ সালের পর বহু দশক ধরে গড়ে তুলেছিল।
এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রও বদলে গেছে। ন্যাটো প্রতিষ্ঠার সময় তার সদস্যরা বিশ্ব জিডিপির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করত। এখন সেই অংশ অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে, আর এশিয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ ন্যাটো কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকেও আগের অবস্থানে নেই। এই বাস্তবতা না বুঝে পুরোনো কৌশলে চলতে থাকলে জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
তৃতীয় সংকট ভূরাজনৈতিক নেতৃত্বে। শীতল যুদ্ধের সময় ন্যাটোর সামনে একটি পরিষ্কার কাঠামো ছিল। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, অন্যদিকে পশ্চিমা জোট। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রাধান্যকে প্রায় স্থায়ী ধরে নেওয়া হয়েছিল। এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়েই ন্যাটোর সম্প্রসারণ, সামরিক আত্মবিশ্বাস এবং বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের কৌশল এগিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা দেখিয়েছে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত করে না।
আফগানিস্তান যুদ্ধ এই সীমাবদ্ধতার বড় উদাহরণ। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর ন্যাটো তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ সামরিক অভিযানে অংশ নেয়। দুই দশক ধরে বিপুল সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি ব্যবহারের পরও তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ করা যায়, কিন্তু স্থায়ী নিরাপত্তা তৈরি করতে হলে কূটনীতি, প্রতিষ্ঠান গঠন, স্থানীয় বাস্তবতা বোঝা, আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা দরকার।
আজকের বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখন নিরাপত্তা শুধু ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সেনা মোতায়েনের বিষয় নয়। অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং সাইবার যুদ্ধ—সবকিছু মিলে নিরাপত্তার ধারণাকে বদলে দিয়েছে। তাই ন্যাটোর প্রয়োজন শুধু প্রতিরোধক্ষমতা নয়, দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতি ও বাস্তবসম্মত ভূরাজনৈতিক চিন্তা।
ইউরোপের নিজের মধ্যেও একটি বড় কৌশলগত বৈপরীত্য আছে। ইউক্রেন, কৃষ্ণসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্য এখন পরস্পর সংযুক্ত অস্থিরতার অঞ্চল হয়ে উঠেছে। অথচ এই তিন অঞ্চলের সংযোগস্থলে থাকা তুরস্ক এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে। ইউরোপ যদি সত্যিকারের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন চায়, তবে নিরাপত্তা কাঠামোকে খণ্ডিত রেখে তা অর্জন করা কঠিন।
ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদান জোটের উত্তর দিককে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু দক্ষিণ দিকের নিরাপত্তা কাঠামো অনেকাংশে তুরস্কের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। তাই তুরস্ককে শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতায় নয়, ইউরোপের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার প্রশ্নটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
চতুর্থ সংকট আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে। কোনো জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে সে নিজের ঘোষিত নীতিগুলো কতটা মানে তার ওপর। কিন্তু যখন বড় শক্তির রাজনীতি আন্তর্জাতিক আইনকে সরিয়ে দেয়, তখন নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলসংক্রান্ত হুমকি এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ন্যাটোর প্রধান শক্তি যদি নিজের জোটসঙ্গীর সার্বভৌমত্ব নিয়ে এমন অবস্থান নেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি জোটের অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ন্যাটোর উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর মতভেদ। মিত্রদের মধ্যে মতবিরোধ নতুন নয়। ইরাক যুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদারদের মধ্যে বড় বিভাজন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু তখনও উভয় পক্ষ ন্যাটোকে আটলান্টিকপারের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে করত। আজকের মতভেদ আরও গভীর, কারণ এটি শুধু নীতির পার্থক্য নয়; জোটের চরিত্র ও ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোকে ক্রমেই লেনদেনভিত্তিক ব্যবস্থার মতো দেখেছে—যেখানে মিত্রতার চেয়ে হিসাব-নিকাশ বড় হয়ে ওঠে। বড় পররাষ্ট্রনীতি সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ না করা জোটের আস্থাকে দুর্বল করে। ইরান যুদ্ধের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে। এই সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিন্যাস বদলে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যাটোর সম্মিলিত ভূমিকা দৃশ্যমান নয়।
এ ধরনের পরিস্থিতি মিত্রতার জন্য বিপজ্জনক। কোনো সদস্য রাষ্ট্র যদি এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যা অন্যরা সম্মিলিতভাবে বেছে নেয়নি বা রাজনৈতিকভাবে অনুমোদন করেনি, তাহলে নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয়ে যায়। জোটের শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়; সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাস, পরামর্শ এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্তের সংস্কৃতিতেও।
সব মিলিয়ে ন্যাটোর সংকট সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি পরিচয়ের সংকট। তাই সমাধানও শুধু প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো বা নতুন অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ন্যাটোর প্রয়োজন নতুন করে নিজের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্ধারণ করা। গণতান্ত্রিক বৈধতা, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং বদলে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশলগত দর্শন ছাড়া জোটটি ধীরে ধীরে কেবল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পরিবর্তনশীল জাতীয় স্বার্থের যন্ত্রে পরিণত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাশিয়া, চীন বা অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির ওপর নয়; বরং ন্যাটো নিজে কী হতে চায় তার ওপর। এটি কি শুধু সামরিক জোট থাকবে, নাকি গণতন্ত্র, মানবিক নীতি এবং আইনের শাসনের বিশ্বাসযোগ্য রক্ষক হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠন করবে? আঙ্কারার বৈঠকের আসল গুরুত্ব এখানেই—ন্যাটো কত শক্তিশালী, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ন্যাটো আসলে কী রক্ষা করতে চায়।

