আঙ্কারার আকাশে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিমান নামল, তখন যেন গোটা জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে একরাশ প্রশ্নও সঙ্গে করে নিয়ে এল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নিজে বিমানবন্দরে গিয়ে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন—এই দৃশ্যই বলে দিচ্ছে, আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। তারিখটি ৭ জুলাই, ২০২৬।
তবে চমকটা লুকিয়ে ছিল অন্যখানে। সম্মেলন শুরুরও আগে, মঙ্গলবার তুরস্কে বসেই ন্যাটো নেতারা ঘোষণা করে বসলেন শত শত কোটি ডলারের একগুচ্ছ অস্ত্রচুক্তি। এই ঘোষণা নিছক কোনো প্রতিরক্ষা-বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং এটিকে দেখা যেতে পারে জোটের ভেতরে জমে থাকা টানাপোড়েন সামলানোর একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে।
রুটের মঞ্চে একের পর এক চমক
রাজধানী আঙ্কারায় আয়োজিত একটি প্রতিরক্ষা শিল্প ফোরামে দাঁড়িয়ে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে যেন একে একে খুলতে থাকলেন উপহারের বাক্স। বড় পর্দায় একের পর এক চুক্তির অঙ্ক ভেসে উঠছিল, যা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, জোট এবার সত্যিই বড় বাজি ধরেছে। রুটের বক্তব্যের সারমর্ম ছিল এমন—একসঙ্গে কাজ করলে মিত্ররা আলাদাভাবে যা পারে, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্জন সম্ভব, আর তাই নতুন একটি বহুজাতিক ক্রয়জোটে যোগ দিচ্ছে সদস্য দেশগুলো, যাতে প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম আরও সহজে ও বড় পরিসরে সংগ্রহ করা যায়।
এই ঘোষণাগুলো এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল, স্পষ্টতই শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চে চমক তৈরির উদ্দেশ্যে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মার্কিন প্রতিষ্ঠান নর্থরপ গ্রুম্যানের কাছ থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর নজরদারি ড্রোন কেনার সিদ্ধান্ত এবং সুইডিশ প্রতিষ্ঠান সাব থেকে বিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা। শুধু তা-ই নয়, আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে ন্যাটো মিত্ররা একসঙ্গে বিনিয়োগ করবে ৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে সূত্রের বরাতে—ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় যে ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা তুঙ্গে, সেগুলো ইউরোপের মাটিতেই যৌথভাবে উৎপাদনের বিষয়ে জার্মানিসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, ইরান ও ইউক্রেন—দুই ফ্রন্টে যুদ্ধের চাপে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে, আর এ নিয়ে ওয়াশিংটনের অন্দরেই বাড়ছে দুশ্চিন্তা।
তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচিতে ফেরানোর সম্ভাবনা
আঙ্কারা সফরে গিয়ে এরদোয়ানের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসবেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার সন্ধ্যার নৈশভোজ দিয়েই মূলত শুরু হচ্ছে ন্যাটোর এই শীর্ষ সম্মেলন, যেখানে ট্রাম্পও উপস্থিত থাকছেন।
এই বৈঠক ঘিরে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সূত্র বলছে, ট্রাম্প এরদোয়ানকে জানাতে পারেন যে তিনি তুরস্ককে আবার এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী। প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে তুরস্ক যখন রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র আঙ্কারার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছিল এবং তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দিয়েছিল। এখন সাত বছর পর সেই সিদ্ধান্ত উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়াটা কূটনৈতিক দিক থেকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ আর তার প্রভাব
এই বিপুল অস্ত্রচুক্তি হুট করে আকাশ থেকে পড়েনি। বহুদিন ধরেই ট্রাম্প অভিযোগ করে আসছেন, ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষায় যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করছে না, বরং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। সফরের ঠিক আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায়ও তিনি ইউরোপকে প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন হামলার পর থেকে জোটের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সেই সংঘাতে পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ট্রাম্প বারবার সমালোচনা করেছেন ন্যাটো সদস্যদের। এমনকি একাধিকবার জোট ছেড়ে দেওয়ার কিংবা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
এর পাশাপাশি বাস্তবেও পরিবর্তন এসেছে—যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে, ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় নিজেদের বাহিনীর সংখ্যা কমিয়েছে, আর ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে শুরু করেছে ছয় মাসব্যাপী এক পর্যালোচনা প্রক্রিয়া। এই পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট বার্তা দেয়—যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপের নিরাপত্তা ইস্যুতে আগের মতো নিঃশর্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে রাজি নয়।
ইউরোপের ক্ষোভ, তবু দায়িত্ব পালনের চেষ্টা
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুব্ধ, কারণ তাদের দাবি—ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। অথচ নিজেদের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেও, ইউরোপজুড়ে অজনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও, তারা মোটামুটিভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে গেছে। এই দ্বৈততা—ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ, অথচ বাইরে সহযোগিতা—আসলে দেখিয়ে দেয় যে ইউরোপের হাতে এই মুহূর্তে বিকল্প খুব সীমিত।
সোমবার রুটে নিজেই স্বীকার করেছেন যে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তৈরি হওয়া নিরাপত্তা শঙ্কা এবং ট্রাম্পের অত্যন্ত জোরালো চাপের কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় অভাবনীয়ভাবে বাড়িয়েছে। পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলছে—গত জুনে জানানো হয়েছিল, ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্য দেশ ও কানাডা ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ৯০ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে। মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—এগুলো আসলে একধরনের রাজনৈতিক বার্তা। ইউরোপ যেন প্রমাণ করতে চাইছে, তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে সিরিয়াস, আর এই বিপুল অস্ত্রচুক্তিগুলো সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করার একটি কৌশল।
সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ, নাকি সাময়িক শান্তির চেষ্টা
এই মেগা অস্ত্রচুক্তিকে অনেকে দেখছেন ট্রাম্পের সঙ্গে ইউরোপের দূরত্ব ঘোচানোর একটি সুযোগ হিসেবে। তবে বাস্তবতা হলো, ইউরোপীয় কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করছেন যে তারা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সমালোচনার পুনরাবৃত্তির জন্য প্রস্তুত থাকলেও, শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক ফল আসবে কি না, তা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত নন। অর্থাৎ, এই বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও সম্পর্কের ভিত্তি এখনো অনেকটাই নড়বড়ে।
কিছু নেতার সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনও এই উদ্বেগকে আরও গভীর করছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বিরোধ তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। এর আগে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সঙ্গেও তার সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছিল। এই ধরনের ব্যক্তিগত টানাপোড়েন কখনো কখনো প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে জোটের ভবিষ্যৎ গতিপথে।
ইউক্রেনের প্রতি প্রতিশ্রুতি আর যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা
এই শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো সদস্যরা ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন আরও একবার নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। জানা যাচ্ছে, ২০২৬ সালে ৭০ বিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে জোট।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই যুদ্ধ কতটা রক্তক্ষয়ী। সোমবারই রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে কিয়েভ অঞ্চলে অন্তত ২৮ জনকে হত্যা করেছে। এই হামলা একইসঙ্গে সামনে এনে দিয়েছে ইউক্রেনের হাতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুতর সংকটও। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি যত বড়ই হোক না কেন, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র সরবরাহের ঘাটতি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
সবমিলিয়ে চিত্রটা কী বলছে
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে মার্কিন হামলা—এই দুটি ঘটনা মিলিয়ে বৈশ্বিক উত্তেজনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ন্যাটোর ভেতরকার নিরাপত্তা উদ্বেগকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় জোট যে বিপুল বিনিয়োগ ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে, তা স্পষ্টতই একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ।
তবে একইসঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু হোক বা ইরান যুদ্ধ—যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা মেরামতের একটি বাস্তব সুযোগ হিসেবেও এই শীর্ষ সম্মেলনকে দেখা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো—শুধু অর্থ আর অস্ত্রের বিনিময়ে কি সত্যিই আস্থার সেই পুরনো ভিত্তি ফিরে আসবে, নাকি এটি হবে সাময়িক এক স্বস্তির উপায় মাত্র? এর উত্তর পাওয়া যাবে আগামী দিনগুলোতে, যখন সম্মেলনের ঘোষণাগুলো বাস্তবায়নের মুখোমুখি হবে।

