ইরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক হামলার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। ফলে বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
৯ জুলাই প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গ্রিনিচ সময় রাত ১২টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৮ সেন্ট বা প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ৭৮ দশমিক ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ৭৪ সেন্ট বা ১ দশমিক ০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ২৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত প্রশমিত হবে—এমন প্রত্যাশা অনেকটাই কমে গেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই অনিশ্চয়তাই আন্তর্জাতিক তেলের দামে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের আটজন সেনা সদস্য নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (৮ জুলাই) ভোরে দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস ও বুশেহর এলাকায় চালানো হামলায় বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যরা নিহত হন। এই ঘটনায় ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
হামলার জবাবে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় প্রথম ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, কুয়েতে অবস্থিত ক্যাম্প আরিফজান ও আলি আল সালেম সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বাহরাইনের জুফায়ের ও শেখ ইসা ঘাঁটিকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। যদিও এসব হামলার ক্ষয়ক্ষতি বা দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা যত দীর্ঘায়িত হবে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর তার প্রভাবও তত গভীর হতে পারে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে তেলের দামে, যা পরে বিশ্বজুড়ে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং ভোক্তা পর্যায়ের ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যদি বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না হয় এবং উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ফলে আগামী কয়েক দিন বিশ্ববাজারের তেলের দামের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

