বিশ্ব অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন, উৎপাদনক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ভারতের পুনেতে অবস্থিত সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে জীবিত প্রতি তিন শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত টিকা গ্রহণ করেছে।
১৯৬৬ সালে সাইরাস পুনাওয়ালার হাত ধরে একটি ঘোড়ার খামার থেকে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। নেদারল্যান্ডস থেকে পোলিও টিকার উন্নত প্রযুক্তি অর্জনের পর প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে ভারতের মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ব্র্যান্ড। অনেকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের জন ডিয়ার এ ক্ষেত্রে শীর্ষে থাকলেও উৎপাদন ও বিক্রির হিসাবে দীর্ঘদিন ধরেই মাহিন্দ্রা বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে।
প্রতিষ্ঠানটি জাপানের মর্যাদাপূর্ণ ডেমিং প্রাইজ এবং জাপান কোয়ালিটি মেডেল অর্জন করেছে। শুধু ভারতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও তারা টেকসই, তুলনামূলক কম খরচের এবং সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য ট্রাক্টর সরবরাহ করে কৃষকদের আস্থা অর্জন করেছে।
ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ডক্টর রেড্ডিস ল্যাবরেটরিজ। আশির দশকে হায়দ্রাবাদে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জনপ্রিয় ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে।
প্রতিষ্ঠানটি নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত প্রথম এশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর একটি। তাদের উৎপাদিত জেনেরিক ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তুলনামূলক কম দামে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সহায়তা করেছে।
জ্বালানি খাতে ভারতের অন্যতম বড় শক্তি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের গুজরাটের জামনগর রিফাইনারি। একক স্থাপনায় এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে উন্নত তেল শোধনাগারগুলোর একটি।
প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে এই স্থাপনার। বিশেষ ধরনের প্রযুক্তির মাধ্যমে নিম্নমানের ও উচ্চ সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল থেকেও উন্নত মানের জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হয়। শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও প্রতিষ্ঠানটি উদ্যোগ নিয়েছে। রিফাইনারির আশপাশে এক লাখের বেশি আমগাছ রোপণের মাধ্যমে সেখানে এশিয়ার অন্যতম বড় আমবাগান গড়ে তোলা হয়েছে।
ভারতের বায়োটেক শিল্পের অন্যতম সফল নাম বায়োকন। ১৯৭৮ সালে কিরণ মজুমদার-শ’ মাত্র ১০ হাজার রুপি মূলধন নিয়ে একটি গ্যারেজে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বায়োসিমিলার ওষুধ উৎপাদন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (FDA) মানদণ্ড পূরণ করে তৈরি এসব ওষুধ অনেক দেশে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিশ্ব সফটওয়্যার খাতে ব্যতিক্রমী সাফল্যের উদাহরণ জোহো কর্পোরেশন। শ্রীধর ভেম্বুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি বাইরের বড় বিনিয়োগ ছাড়াই বিশ্বের ১০ কোটির বেশি গ্রাহককে বিভিন্ন সফটওয়্যার সেবা দিচ্ছে।
জোহোর বিশেষত্ব শুধু প্রযুক্তিতেই নয়। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের গ্রামীণ এলাকার তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাও তাদের ই-মেইল ও ক্লাউডভিত্তিক সেবা ব্যবহার করছে।
ভারী শিল্প সরঞ্জাম তৈরিতে লারসেন অ্যান্ড টুবরো (এলঅ্যান্ডটি) দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত একটি নাম। গুজরাটের হাজিরা কারখানায় তারা তেল, গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল ও সার শিল্পে ব্যবহৃত বিশাল আকারের জটিল যন্ত্রাংশ তৈরি করে।
মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বড় শিল্পপ্রকল্পে ব্যবহারের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম নিয়মিত রপ্তানি করা হয়। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বহু দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রকল্পে অংশীদার হয়েছে।
ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ধ্রুব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছে। ২০০৮ সালে ক্লাউড-নেটিভ ডেটা সুরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার সেবা দিয়ে থাকে। নাসা, ফাইজার এবং ম্যারিয়টের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ধ্রুব ক্লাউডভিত্তিক ডেটা সুরক্ষার বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষিযন্ত্র, সাশ্রয়ী ওষুধ, জ্বালানি, বায়োটেক, সফটওয়্যার, ভারী প্রকৌশল এবং তথ্য সুরক্ষা—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। উদ্ভাবন, উৎপাদনক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার মাধ্যমে তারা শুধু ভারতের অর্থনীতিকেই এগিয়ে নিচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

