যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় এখন জন্ম নিচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। পরিবার হারানো কিংবা জন্মের পরই পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া শিশুদের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্র পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবর্তে তাদের বড় করে তোলার দায়িত্ব নিচ্ছে সাধারণ পরিবার। সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় বাধা অতিক্রম করে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই পারিবারিক লালন-পালন ব্যবস্থা।
চাইল্ড হাউসেস নামের একটি সিরীয় সংগঠনের সমাজকর্মী সুয়েদান এক নবজাতকের ছবি দেখিয়ে বলেন, শিশুটির জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে একটি ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হয়েছিল। খাবারের খোঁজে আসা একটি প্রাণীর আক্রমণে তার মুখ রক্তাক্ত হয়ে যায়। এ ধরনের ঘটনা সিরিয়ায় বিরল নয়। দারিদ্র্য, সামাজিক লজ্জা এবং ধর্মীয় নানা কারণে অনেক নবজাতককে মসজিদের সামনে, হাসপাতালের গেট কিংবা রাস্তায় ফেলে রেখে যায় পরিবার। অনেক শিশুর শরীরে তখনও জন্মের প্রাকৃতিক আবরণ লেগে থাকে।
২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চাইল্ড হাউসেস প্রায় ২০০ জন পরিত্যক্ত শিশুকে বিভিন্ন পালক পরিবারের কাছে নিরাপদ আশ্রয় দিতে সক্ষম হয়েছে। সিরিয়া পুনরায় একীভূত হওয়ার পর আরও প্রায় ১০০ শিশুকে একইভাবে পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে।
দামেস্কের উপকণ্ঠে লাহন আল-হায়াত নামে একটি সরকারি শিশু আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের আমলে এটি ছিল বিতর্কিত একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ ছিল, বন্দিদের সন্তানদের এখানে গোপনে রাখা হতো।
তবে সরকারের পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায়ও এসেছে পরিবর্তন। এখন সেখানে থাকা শিশুদের নিরাপত্তা, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য নতুন নীতিমালা চালু হয়েছে। শিশুদের ডিজিটাল নিবন্ধন, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং পরিবারভিত্তিক পরিচর্যার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চাইল্ড হাউসেসের নির্বাহী পরিচালক ফয়সাল আল-হাম্মুদ বলেন, আগে শিশুদের অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রশাসনিক সম্পদের মতো ব্যবহার করা হতো। এখন তাদের প্রকৃত শিশু হিসেবেই দেখা হচ্ছে এবং তাদের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সিরিয়াসহ অধিকাংশ আরব দেশে পশ্চিমা ধাঁচের দত্তক গ্রহণ আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়। ইসলামি শরিয়ায় সন্তানের বংশপরিচয় সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এ কারণে চাইল্ড হাউসেস ইসলামি ‘কাফালা’ ব্যবস্থার ভিত্তিতে একটি বিকল্প মডেল তৈরি করেছে। এই ব্যবস্থায় শিশুটি পালক পরিবারের ভালোবাসা ও যত্ন পায়, কিন্তু তাদের পারিবারিক নাম গ্রহণ করে না এবং উত্তরাধিকারও পায় না। ভবিষ্যতে জৈবিক পরিবার শিশুকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
লাহন আল-হায়াতের পরিচালক মুতাসেম আল-সাল্লুমি মনে করেন, কোনো প্রতিষ্ঠান কখনোই একটি পরিবারের ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে না। তার ভাষায়, বাবা-মায়ের স্নেহ, পারিবারিক পরিবেশ এবং স্বাভাবিক জীবনের অভিজ্ঞতা একটি শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
তবে যেসব শিশুকে বিভিন্ন কারণে পালক পরিবারের কাছে দেওয়া সম্ভব হয় না, তাদের জন্যও আশ্রয়কেন্দ্রে পরিবারসদৃশ পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। একই বয়সী শিশুদের ছোট ছোট ইউনিটে রাখা হয় এবং কয়েকজন শিশুর দায়িত্বে থাকেন একজন নির্দিষ্ট পরিচর্যাকারী, যাকে শিশুরা ‘মা’ বলেই ডাকে।
সিরিয়ার সমাজে অজ্ঞাত পরিচয়ের শিশুদের প্রতি দীর্ঘদিন ধরেই নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। বিয়ের বাইরে জন্ম নেওয়া শিশু কিংবা ধর্ষণের শিকার নারীর সন্তান—উভয় ক্ষেত্রেই সামাজিক লজ্জার ভার অনেক সময় শিশুটিকেই বহন করতে হয়। শিশুর জৈবিক পরিবারকে খুঁজে বের করার জন্য সমাজকর্মীরা সাধারণত তিন মাস চেষ্টা চালান। আত্মীয়স্বজনের সন্ধান মিললেও সব ক্ষেত্রে শিশুকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।
একসময় সরকারি নথিতে এসব শিশুর পরিচয়ের জন্য অপমানজনক একটি আরবি শব্দ ব্যবহার করা হতো, যার অর্থ ছিল ‘জারজ’। চাইল্ড হাউসেসের উদ্যোগে এখন সেই প্রথা তুলে দিয়ে কোড নম্বরভিত্তিক পরিচয় ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবুও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এখনও সহজ নয়। অনেক পালক মা সামাজিক সমালোচনার ভয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করেন।
দীর্ঘ ১৪ বছরের যুদ্ধ এবং ২০২৩ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্প সিরিয়ায় হাজার হাজার শিশুকে এতিম, বাস্তুচ্যুত বা অসহায় করে তোলে। একই সময়ে অনেক নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান লালন-পালনের সুযোগ খুঁজছিলেন। এই বাস্তবতা থেকেই পরিবারভিত্তিক পরিচর্যার ধারণা সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে।
আহমাদের পালক মা খাওলা জানান, ভূমিকম্পের পর এতিম শিশুদের খবর দেখে প্রথমবার একটি শিশুকে নিজের পরিবারে নেওয়ার কথা ভাবেন। পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় ধর্মীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা শেষে তারা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, দীর্ঘ ১৩ বছর সন্তান না হওয়ার পর আহমাদ তাদের ঘরে আসে।
খাওলা বলেন, দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকার কারণে সমাজের নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে। অনেকেই নিজের সন্তানকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। আহমাদের আগমন সেই মানসিক কষ্ট দূর করেছে এবং নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে।
আহমাদের বাবা-মায়ের কাছে তার অতীত নয়, ভবিষ্যৎই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার বাবা বলেন, কেউ যদি একটি কথার মাধ্যমেও শিশুটিকে আঘাত করতে চায়, তবে তিনি সন্তানের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবেন।
আলিয়া ও তার স্বামীও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০২৪ সালে তারা ফারাহকে এবং ২০২৫ সালে নেসমেকে নিজেদের পরিবারে স্বাগত জানান। প্রথমদিকে অনেকে জানতে চাইতেন, শিশুদের আসল পরিবার কারা। কেউ কেউ ইঙ্গিত দিতেন, হয়তো তারা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্তান।
কিন্তু দম্পতি এসব মন্তব্যকে গুরুত্ব দেননি। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, দুই শিশুই যেন নিরাপদ, স্নেহময় একটি পরিবারে বড় হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সমালোচকরাও নিজেদের অবস্থান বদলাতে শুরু করেন। যারা আগে বিরোধিতা করতেন, তাদের মধ্যেই অনেকে পরে পালক পরিবার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চাইল্ড হাউসেসের কর্মকর্তাদের মতে, একটি পরিবার যখন একজন শিশুকে গ্রহণ করে, তখন শুধু সেই শিশুর জীবনই বদলায় না; আশপাশের মানুষও নতুনভাবে বিষয়টি দেখতে শেখে।
পালক পরিবারের কাছে শিশুদের তুলে দেওয়ার পরও কাজ শেষ হয়ে যায় না। নিয়মিত বাড়ি পরিদর্শন, মানসিক সহায়তা এবং শিশুদের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়। সব পালক পরিবারকে একটি অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমেও যুক্ত রাখা হয়েছে। সেখানে তারা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন, শিশুদের বেড়ে ওঠার গল্প জানান এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খোঁজেন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটি—শিশুরা বড় হলে কীভাবে এবং কখন তাদের জন্মপরিচয় জানানো হবে?
এই নতুন প্রজন্মের শিশুদের কথা মাথায় রেখে বিশেষ মানসিক সহায়তা ও নির্দেশনা তৈরির কাজও শুরু করেছে চাইল্ড হাউসেস। দীর্ঘদিন ধরে অজ্ঞাত পরিচয়ের শিশুদের ভাগ্য নির্ধারণ করত অনাথাশ্রমের চার দেয়াল। কিন্তু এখন কিছু সাহসী পরিবার সেই ইতিহাস বদলে দিচ্ছে। তাদের ঘরে আশ্রয় পাওয়া প্রতিটি শিশুর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সিরিয়ার সমাজও—একটি পরিবার, একটি শিশু এবং একটি নতুন ভবিষ্যতের গল্প লিখে।

